ইলিশ উৎসবে ছোট মামা
আশীষ কুমার রায়
২৭/০৯/২০২৫
ভানগড়ের অভিজ্ঞতা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ছোট মামা তার নতুন ট্রিপের প্ল্যান নিয়ে হাজির, আমরা পাঁচজন মানে আমি ,বাবলু,মৌ,তুলি আর বাবাই তখন আমাদের চিলেকোঠার ঘরে আড্ডা দিচ্ছি,আমার নামতো আপনারা জানেন আমি হলাম বাবুন।
ছোট মামা ঘরে ঢুকেই একটা চেয়ার টেনে বসেই বলে বাবুন তুই তুলি আর মৌ কে নিয়ে নীচে যা, আমি আমি বাড়ির সবার জন্যে কলেজ স্ট্রিটের তেলেভাজা শপ আরে যেটা বুড়োদার চপ শিল্প নামে বিখ্যাত,সেখান থেকে চপ নিয়ে এসেছি, তোরা নীচে যা আর আমাদের জন্যে নিয়ে আয় আর আমি তোর মাকে কড়া করে আমার জন্যে চা বানাতে বলেছি সেটাও আসার সময় নিয়ে আসবি, তোরা তাড়াতাড়ি আসবি,আমার একটা ট্রিপের প্ল্যান আছে,তোরা আসলেই সেটা নিয়ে আলোচনায় বসবো, আমরা নীচের তলায় চলে গেলাম,যাওয়ার পথে তুলি আমায় বলে আচ্ছা বাবুনদা ছোট মামার এবারের প্ল্যান সম্পর্কে কিছু আন্দাজ করতে পারছিস,আমি বললাম আরে আমি তো কোন ছার তোরা জানিসনা যে ছোট মামার মাথায় কখন কোন প্ল্যান আসে তা ভগবানের পক্ষেও বোঝা অসাধ্য, শুনে ওরা হেসে দিলো।আমরা চপ , মুড়ি আর চা নিয়ে আসলাম,আমাদের খাওয়ার পরে ছোট মামাও তার চা খাওয়া শেষ করে চায়ের কাপটা টেবিলের উপর রাখলো।
এবার ছোট মামা তার প্ল্যান নিয়ে আলোচনা শুরু করলো,ছোট মামা বলে দেখ আমরা এবার যেখানে যাবো সেখানে আমাদের দু তিন দিনের মধ্যেই যেতে হবে না হলে আসল মজাই মিস করবো, বাবলু বলে আচ্ছা ছোট মামা আমরা এমন কোথায় যাবো যে এত তাড়াহুড়ো করে যেতে হবে, ছোট মামা বলে আমরা এবার সুন্দরবন যাবো, শুনে বাবাই বলে আচ্ছা ছোট মামা আমরা যখন সুন্দরবন যাবো তার জন্যে এত তাড়াহুড়ো কিসের,ছোট মামা বলে তোরা বেকার পড়াশোনা করছিস,দুনিয়ার কোন খবর রাখিস না, তোরা জানিসনা যে এই সময় সুন্দরবনে ইলিশ মেলা বা উৎসব হয়। সুন্দরবনের ইলিশ মেলা বা সুন্দরবন ইলিশ উৎসব হলো একটা বার্ষিক উৎসব যা এই সময়েই হয়,যখন সুন্দরবনের নদীতে ইলিশ মাছ পাওয়া যায়,এই মেলায় ইলিশ পোলাও,ইলিশ ভাপা,সর্ষে ইলিশ,ইলিশ ভাজা, ইলিশ মাছের পাতুরি এবং ইলিশ বিরিয়ানি পাওয়া যায়,এছাড়াও চিংড়ি ও কাঁকড়ার নানান পদও পাওয়া যায়।এই উৎসবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং লোকসংগীতের আয়োজন করা হয় আর সেই সঙ্গে থাকে স্থানীয় হস্তশিল্পের মেলা,তুলি বলে এইবার বুঝলাম তুমি কেনো দু একদিনের মধ্যেই যেতে বলছো।
শোন আমরা যাবো সুন্দর বনের সজনেখালি, ওখানে নৌকাতেই ইলিশ মাছের বিভিন্ন ধরনের পদ পরিবেশন করা হয়,আমরা ওখানে নৌকাতেই ইলিশ মেলা পালন করবো,আমরা সবাই বললাম উফ এটাতো তোমার জব্বর আইডিয়া,ছোট মামা বলে আমার সব প্ল্যানই জব্বর হয়,আর শোন সুন্দরবনের সজনেখালি যাওয়ার পিছনে আমার আরও একটা কারণ আছে মানে আমরা এক ঢিলে দুই পাখি মারবো,বাবাই বলে সেটা কিরকম ছোট মামা,ছোট মামা বলে সজনেখালির টাইগার রিজার্ভের মানে মোদ্দা কথায় সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের মধ্যে নৌকায় করে বাঘ দেখা যায়,কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট স্থান বলা কঠিন,কারণ এটা আসলে বনের সরু জলপথ এবং খাঁড়ির মধ্যে,বাঘ দেখার সম্ভাবনা বাড়ে যখন জোয়ারের সময় বা ভোরের দিকে নদী ও খাঁড়িগুলোতে বাঘেরা বেশি আনাগোনা করে,আরে প্রয়োজন হলে আমরা আমাদের নৌকা তীরে দাঁড় করিয়ে না হয় পায়ে হেঁটেই বাঘের খোঁজ করবো,ছোট মামার এই দ্বিতীয় পরিকল্পনা শুনে আমরা ইলিশ মেলায় যাওয়ার কথা শুনে যতটা আনন্দিত হয়েছিলাম তার চেয়ে দশগুণ বেশি ভয় পেলাম।মৌ বলে আচ্ছা ছোট মামা নৌকাতেই বসে আমরা অপেক্ষা করবো,কপালে থাকলে ঠিক বাঘের দেখা পাবো,আবার জঙ্গলে গিয়ে লাভ কি,আমি শুনেছি বাঘ জঙ্গলের গভীরে শিকার খোঁজে আর মানুষের উপর আক্রমণও করতে পারে,বিশেষ করে যদি ওরা মানুষকে জঙ্গলের ভেতরে দেখে।ছোট মামা হেসে বলে তোরা আমার ভাগ্নে,ভাগ্নি হয়ে এত কাপুরুষ হবি আমি ভাবতেই পারছি না,তোরা একটা কথা কেনো ভুলে যাচ্ছিস তোদের সাথে আমি তো থাকবো,আর তোরা জানিসনা হয়তো একসময় শিকার আমার শখ ছিলো,আমি বললাম হ্যাঁ মা আমাদের সেকথা বলেছে তবে আমি যতদূর জানি তোমার শখ ছিলো কিন্তু কোনদিন শিকার করোনি,ছোট মামা বলে ডেপোমি করিস না,জানবি শিকারের প্রতি প্রবল শখ থাকা মানেই অর্ধেক শিকার করা,আমরা আর কোনও কথা না বলে পরস্পরের দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকালাম।
ছোট মামা বলে শোন আমি পরশু সকাল সাড়ে পাঁচটার মধ্যে গাড়ি নিয়ে চলে আসবো তোরা রেডি হয়ে থাকবি, আমরা কোলকাতা থেকে সজনেখালি যাওয়ার জন্য গাড়ি নিয়ে গোদখালি ফেরি ঘাট পর্যন্ত যাবো, গাড়ি নিয়ে যেতে হবে ১৩০ কিলোমিটারের মতন।আমরা ই,এম বাইপাস, বানতলা, ঘটক পুকুর,বাসন্তী হয়ে গদখালী যাবো।গদখালী থেকে আমরা ফেরি বোটে করে সজনেখালি যাবো,কারণ এটা জলপথ, গদখালীতে আমরা গাড়ি পার্ক করবো।
ছোট মামা বলে তাহলে ওই কথাই রইলো আমি পরশু ভোরে চলে আসছি,শোন আমি তো দূরবীন নেবো,তোরাও তোদের যার যার কাছে দূরবীন আছে নিয়ে নিবি, আমি বলি আমাদের সবার কাছেই আছে,ছোট মামা বলে তাহলে তো কোন সমস্যাই নেই, আসলে আমাদের দূরবীন দিয়ে বাঘের গতিবিধির উপর নজর রাখতে হবে,এবার ছোট মামা বলে আমি নীচে গিয়ে সবাইকে আমাদের যাওয়ার ব্যাপারে বলে দিচ্ছি,তোদের আর ওদেরকে বেশি কিছু বলতে হবে না,এই কথা বলেই গটগট করে ছোট মামা নীচে চলে গেলো,বাবলু বলে আচ্ছা বলতো ছোট মামা অত তাড়াহুড়ো করে কেনো আমাদের না নিয়েই সবাইকে বলতে গেলো, মৌ বলে কেনোরে বাবলুদা,,বাবলু বলে ছোট মামা সবাইকে গিয়ে বলবে ইলিশ মেলায় আমরা যাবো,ছোট মামার যে এর সাথে ব্যাঘ্র দর্শনের অভিপ্রায় আছে সেটা বলবে না, আমাদের সঙ্গে নিয়ে বলতে গেলে যদি আমাদের মধ্যে থেকে কারোর মুখ থেকে কোন বেফাঁস কথা বেড়িয়ে যায়,তুলি বলে একদম ঠিক বলেছিস আর সেই জন্যেই দেখলিনা ছোট মামা যাবার আগে বলে গেলো আমাদের বেশি কিছু না বলতে।
যাওয়ার দিন ছোট মামা নিজের বলা টাইমের আগেই এসে হাজির,যদিও আমরাও সবাই রেডি হয়ে বসেই ছিলাম,ছোট মামা আসার পরে আমরা আমাদের লাগেজ নিয়ে গাড়িতে রাখতে যেতেই দেখি ছোট মামা তার সাথে একটা রাইফেল নিয়েছে,আমি বললাম ছোট মামা তুমি এটা কি করেছো, তুমি তো জানো সুন্দরবনে ব্যক্তিগতভাবে রাইফেল নিয়ে ঘোরার অনুমতি নেই , সুন্দরবন একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি রক্ষার জন্য কঠোর নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়,সুন্দরবনে অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ। শুধুমাত্র বন্যপ্রাণী রক্ষার জন্য প্রশিক্ষিত বনকর্মীরা অনুমোদিত অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন।ছোট মামা বলে আরে আমি সব জানি,আমি এটা নিয়েছি শুধুমাত্র তোদের প্রোটেকশনের জন্য।বাবলু বলে তুমি ওটা নিয়ে ঢোকার আগেই তো বাজেয়াপ্ত করে নেবে,ছোট মামা অনেকক্ষণ ধরে কি ভাবলো তারপর বলে এটা নিয়ে এখন কি করা যায় বলতো,বাবাই বলে তুমি ওটা আমাদের বাড়িতে রেখে দাও,ছোট মামা আমায় বলে বাবুন তাই কর এটাকে বাড়িতে রেখে আয়, রাইফেল রেখে এসে আমি গাড়িতে বসার পর ছোট মামা গাড়ি স্টার্ট করলো তখন সকাল ছটা বাজে,আমরা যাওয়ার পথে রাস্তায় এক জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নিলাম,আমরা সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ সজনেখালি পৌছলাম।
ছোট মামা কোলকাতা থেকেই একটা ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে ট্যুর প্যাকেজের নৌকাতে আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যাবস্থা করে নিয়েছিল।আমরা ওই নৌকাতেই ইলিশ উৎসব পালন করলাম,ছোট মামা লাঞ্চ আর ডিনারে ইলিশ মাছের মোটামুটি সব আইটেম ভরপুর খেলো,আমরা ছোট মামাকে আগে কোনদিন এত খেতে দেখিনি,রাতভর আমরা বাঘ দেখার আশায় নৌকায় বসে থাকলাম,ছোট মামা রাতে অনেক বার নৌকার শৌচাগারে গেলো আর রাতের অনেকটা সময় সময় শৌচাগারেই সময় কাটালো,বাবাই ছোট মামার বারবার শৌচাগারে যাওয়া দেখে হাসতে হাসতে বললো এটা ইলিশ উৎসবের সাইড এফেক্ট, আমরা হাসতে হাসতে বলি তা যা বলেছিস, যদিও আমরা সারারাত বাঘ দেখার জন্যে উৎসুক হয়ে বসে থাকলাম কিন্তু বাঘ তো দূরের কথা কোনরকম বন্যপ্রাণী দেখতে পেলাম না,সকালে যখন আমরা সজনেখালি ফিরলাম তখন ছোট মামা বলে এখানে একটা গেষ্ট হাউসে আমাদের থাকার বন্দোবস্ত করে রেখেছি,আমরা আজ এখানেই থাকবো কাল সকালে ব্রেকফাস্ট করে কোলকাতার জন্য রওনা দেবো,আর শোন এখানে আমার বলা আছে যে আমাদের জন্য ইলিশ মাছের বিভিন্ন আইটেমের সঙ্গে চিংড়ি মাছের আর কাঁকড়ার আইটেম রাখতে,শুনে তুলি বলে ছোট মামা তুমি আজকেও এসব খাবে,কালকে অর্ধেক রাত তো শৌচাগারে কাটালে,ছোট মামা বলে আরে আমি কি বারবার ওখানে এমনি যাচ্ছিলাম,তবে তোরা শোন আমি ওখান থেকেই তো বাঘের দর্শন পেয়েছি তাও একটা নয় দু দুটো বাঘ দেখেছি,আসলে এতক্ষণ তোদের এই কথা বলিনি পাছে তোরা কষ্ট পাস এই ভেবে যে ছোট মামা বাঘের দেখা পেলো আর আমরা পেলাম না,তুলি আমার কানের সামনে মুখ নিয়ে,আস্তে করে বললো আসলে বাবুনদা মনে হয় পেট গরম থেকেই বাঘ দেখেছে।
ছোট মামা গেষ্ট হাউসে ছোট মামার জন্যে একটা ঘর,আমার,বাবলুর আর বাবাই এর জন্য একটা ঘর এবং তুলি,মৌ এর জন্যে একটা ঘরের ব্যাবস্থা করে রেখেছিল,ছোট মামা সব ট্যুরেই চায় আমরা ছেলেরা তার সাথে এক ঘরে থাকি কিন্তু আমরা ছোট মামার ঘুমের মধ্যে নাসিকা গর্জনের ভয়ে নানান অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে যাই,ছোট মামা তাই এখন আমাদের জন্য আলাদা ঘরের ব্যাবস্থা করে।
ছোট মামা গেষ্ট হাউসে ব্রেকফাস্টে ও বেশ কয়েকটা ইলিশ মাছ ভাজা চোখের নিমেষে খেয়ে নিলো,ব্রেকফাস্ট শেষ করে আমরা আমরা ছোট মামাকে জিজ্ঞাসা করলাম আমরা আজ সারাদিন কি করবো গেষ্ট হাউসেই বসে থাটবো,ছোট মামা বলে তোদের কি মনে হয় তোদের ছোট মামা বেড়াতে এসে বসে থাকার লোক,শোন আমি এখানের ম্যানেজার কে দিয়ে একটা নৌকা ভাড়া করেছি,আমরা মাতলা নদী ধরে ওই নৌকায় ম্যানগ্রোভ বন আর একেবারে শান্ত প্রকৃতির কাছাকাছি যাবো।আমরা বললাম দারুণ আইডিয়া ছোট মামা।আমরা ছোট মামার এই আইডিয়া শুনে আমরা সবাই খুবই উৎফুল্ল হয়েছিলাম কিন্তু তখন আমরা ঘুণাক্ষরেও বুঝতেই পারিনি যে এই নৌকাবিহারে গিয়ে যে আমাদের এতটা নাজেহাল হতে হবে।
আমরা যখন নৌকাবিহারে যাবার জন্য গেষ্ট হাউস থেকে বেড়োচ্ছি তখন ছোট মামা বলে দু মিনিট দাঁড়িয়ে যা তোরা,ছোট মামা ম্যানজার এর দিকে তাকাতেই ম্যানেজার বলে সব রেডি হয়ে গেছে স্যার এই দিলো বলে,আমরা অবাক হয়ে সবাই সবার দিকে তাকালাম,বাবলু বলে আরে ছোট মামা আবার কি নেবে,এই সময় একটা ছেলে এসে একটা বিশাল সাইজের প্যাকেট দিলো ছোট মামার হাতে,ছোট মামা বললো সবকিছু ঠিকঠাক দিয়েছো তো,ছেলেটা বলে হ্যাঁ স্যার আপনি যা যা বলেছিলেন সব আছে এটাতে, ছোট মামা বাবলুর হাতে প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বলে চল এবার যাওয়া যাক।
গেষ্ট হাউস থেকে বেড়োনোর পর মৌ ছোট মামাকে জিজ্ঞাসা করে এই প্যাকেটে কি নিলে,ছোট মামা বলে আরে তেমন কিছুই নেইনি,শুধুমাত্র ইলিশ দোপেয়াজা,ইলিশ মাছ কড়া করে ভাজা,চিংড়ি ভাপা,চিংড়ি ভুনা, চিংড়ি ভাজি,কাঁকড়ার ঘিলুর ভর্তা,কাঁকড়ার ঝাল আর সবার জন্যে পাঁচটা করে নরম তুলতুলে রুমালি রুটি,ছোট মামার এই “শুধুমাত্র আইটেম”শুনে আমাদের সবার “আত্মারাম খাঁচাছাড়া"।বাবাই আমাকে বলে আমি নিশ্চিত ছোট মামা আবার কোন অঘটন ঘটাবে,আমি বললাম আমারও সেটাই মনে হচ্ছে কিন্তু কি করবি বল একমাত্র বড় মামা এখানে থাকলে ছোট মামাকে থামাতে পারতো,আমাদের কারোর কথায় তো পাত্তাই দেবে না।
আমরা মাতলা নদীতে নৌকায় করে ঘুড়ে বেড়াচ্ছি,বেশ মজা লাগছে সবার,এমন সময় তুলি আমাকে কনুইয়ের খোঁচা দিয়ে দেখায় ছোট মামা প্যাকেট খুলে খাবার খেতে শুরু করেছে,আমাদের দিকে তাকিয়ে বলে আরে তোরা দাঁড়িয়ে আছিস কেনো,খেতে খেতে প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ কর,বাবাই বলে কি বলছো এখন খাবো, এইমাত্র তো ব্রেকফাস্ট করলাম,শুনে ছোট মামা বলে তোদের প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের এটাই সমস্যা তোরা খেতে শিখলিনা আর খেয়ে হজমও করতে পারিসনা আর আমাকে দেখ লোহা খেয়েও হজম করতে পারি,আমরা আর কোন কথা না বলে আবার প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ করতে লাগলাম।
বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ দেখি ছোট মামা নৌকার চালকের সাথে গিয়ে কথা বলছে,মনে হল ছোট মামা বেশ কাকুতি মিনতি করছে, তখন আমরা ম্যানগ্রোভ বনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি,আমি আর বাবলু এগিয়ে গিয়ে বলি,কি হয়েছে ছোট মামা,শুনে ছোট মামা বলে আমাকে এই মূহুর্তে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হবে,সেটাই এই মাঝি ভাইকে বলছিলাম,আমরা বলি চলো গেষ্ট হাউসে ফিরি,ছোট মামা পেটে হাত রেখে বলে আরে আমার হাতে অত সময় নেই,ফিরতে ফিরতে হয়তো নৌকাতেই অঘটন ঘটে যাবে,শুনে মাঝি ভাই বলেন আমি বনের পাশে নৌকা দাঁড় করতেছি,আপনি নেইমে জায়গা বুইঝে কইরে আসবেন,ছোট মামা বলে তাই করো, নৌকা বনের পাশে দাঁড়াতে ছোট মামা দৌড় লাগানো ভালো জায়গার সন্ধানে,ছোট মামার পিছনে বাবলু, বাবাই আর আমি নৌকা থেকে নেমে দাঁড়াই,একটু পরে শুনি ছোট মামা বা,বা করে গোঙাচ্ছে,আমরা ছুটে যাই,গিয়ে দেখি ছোট মামা ওখানে শুয়ে শুয়ে সেই বা,বা করে গোঙাচ্ছে,আমরা দেখলাম আমরা যেতেই একটু দূর থেকে একটা বাচ্চা শিয়াল ছুটে পালালো,আমরা ছোট মামার চোখে মুখে জল দিয়ে উঠিয়ে বসাই,ছোট মামাকে বলি কি হয়েছিল,তুমি ওমন বা, বা করছিলে কেনো,ছোট মামা বলে আরে একটা মস্ত বড় রয়েল বেঙ্গল টাইগার প্রায় আমার ঘাড়ের সামনে এসে পড়েছিল,আমি বলি আরে ওটা তো একটা বাচ্চা শিয়াল ছিলো, ছোট মামা রেগে বলে এখন তোদের কাছে শিখতে হবে কোনটা বাঘ আর কোনটা শিয়াল,ওসব ছাড় চল নৌকায় যাই,আমি তোদের কোন বিপদে ফেলতে পারবোনা আর তাছাড়া আমার কাছে তো আমার রাইফেলটাও নেই, থাকলে এক গুলিতেই বাঘটাকে ঢিট করে দিতাম, আমরা নৌকায় ফিরে আসি,সব শুনে তুলি আর মৌ বলে আর ঘুরতে হবে না ছোট মামা চলো আমরা এবার গেষ্ট হাউসে ফিরি, সেইমতো আমরা গেষ্ট হাউসে ফিরলাম,ছোট মামা নিজের ঘরে যাওয়ার পর আমরা সবাই গিয়ে তুলিদের রুমে গিয়ে বসি,আমরা ছোট মামার আজকের কীর্তিকলাপ নিয়ে মজা করছি এমন সময় হোটেলের একটা ছেলে এসে বলে আপনাদের মামা বাবু আপনাদের খাবার টেবিলে খাওয়ার জন্যে ডাকছেন,তুলি আর মৌ আঁতকে উঠে বলে ছোট মামা আবার খাবে, আমি বললাম তোরা মিলিয়ে নিস আজকে আমাদের কপালে শনি ঠাকুর নাচছে।
আমরা খাবার টেবিলে গিয়ে আমাদের মতন করে খেলাম আর ছোট মামা তার স্বভাবসিদ্ধ অনুসারে মনের মতন করে খেলো,খাবার পর বলে চল এবার যার যার ঘরে গিয়ে বিশ্রাম কর আর পাড়লে ঘুমিয়েনে,দেখবি ঘুমিয়ে নিলে এখনের খাবার সব হজম হয়ে যাবে,রাতের জন্যেও ভালো ভালো আইটেম বলে রেখেছি।
আমরা কেউই ঘুমালাম না বরং এক রুমে বসে সবাই আড্ডা দিলাম,দেখতে দেখতে কখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে আমরা কেউ বুঝতেই পারিনি,মৌ বলে সেই থেকে ছোট মামার কোন আওয়াজ পাচ্ছিনা,বাবাই বলে নির্ঘাত ঘুমিয়ে খাবার হজম করছে,তুলি বলে ছোট মামা আসা থেকে যা খাবার খেয়েছে তা হজম করতে তিনদিনের টানা ঘুম দরকার, আমি হেসে বলি তোরা বোস,আমি গিয়ে একবার দেখে আসি,আমি ছোট মামার ঘরে গিয়ে দেখি দরজা খোলাই আছে আর ছোট মামা খাটে শুয়ে ঘুমাচ্ছে,আমি ছোট মামাকে ডাকতে যাবো তখন হঠাৎ করে একটা দুর্গন্ধ আমার
নাকে আসে,আমি ভালো করে তাকিয়ে দেখি ছোট মামা ঘুমাচ্ছে না বরং ছোট মামা মলত্যাগ করে কাপড়ে চোপড়ে এক করে বেহুশ হয়ে পড়ে আছে।
আমি রুমে গিয়ে ওদের সবটা বলি,শুনে সবাই আমার সাথে ছোট মামার রুমে ছুটে আসে,বাবলু বলে তোরা এই দিকটা একটু দেখ আমি গিয়ে ম্যানেজার কে বলে একজন ডাক্তারের ব্যাবস্থা করছি,আমি বললাম তাই কর।
কিছুক্ষণ পরে একজন বয়স্ক ডাক্তার বাবু আসলেন,উনি ছোট মামাকে ভালো করে পরীক্ষা করে আমাদের বললেন খাবারের গন্ডগোলের জন্যে ওনার ডিহাইড্রেশন হয়েছে, উনি ছোট মামাকে একটা ইনজেকশন দিলেন, আমাদের বললেন প্রশান্ত মানে এই গেষ্ট হাউসের ম্যানেজারের সাথে কথা বলে এনাকে ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাও আমি রেফার করে দিচ্ছি,বাবাই ডাক্তার বাবুর ফিস মিটিয়ে ওনাকে এগিয়ে দিয়ে আসতে গেলো,ডাক্তার বাবু যাওয়ার সময় প্রশান্ত বাবুকে সবটা বলে গেলেন,প্রশান্ত বাবু সব শুনে ফোন করে একটা ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স আনালেন এবং ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে ফোন করে গদখালীতে একটা অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর ব্যাবস্থা করলেন,ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সে ছোট মামাকে গদখালী ঘাট পর্যন্ত নিয়ে আসলাম আবার গদখালী থেকে ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম,পৌছানোর পরেই হাসপাতালের একজন ডাক্তার বাবু ছোট মামাকে পরীক্ষা করে সঙ্গে সঙ্গে ছোট মামাকে ভর্তি করে নিলো।
আসার পথে আমরা ফোন করে বাড়িতে সবটা জানালাম,আমরা বড় মামাকেও সব জানালাম।
খবর পেয়েই বড় মামা আর মেজো জেঠু চলে এলো একজন অতিরিক্ত ড্রাইভার মানে ভজনদাকে নিয়ে,পরদিন সকালে আমরা ভজনদাকে নিয়ে গদখালী যাই সেখান থেকে আমাদের গেষ্ট হাউসে,বড় মামা ফোন করে গেষ্ট হাউসের টাকার হিসেব জেনে নিয়ে অনলাইনে পেমেন্ট করে দিয়েছে,আমরা আমাদের লাগেজ আর ছোট মামার লাগেজ নিয়ে গদখালী এসে সেখান থেকে ছোট মামার গাড়ি পার্কিং থেকে নিয়ে ওই গাড়িতে করে আবার হাসপাতালে এলাম,বিকেলে ছোট মামাকে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করার পর আমরা বাড়ি ফেরার জন্য হাসপাতাল থেকে বাইরে আসার পর বড় মামা ছোট মামাকে বলে তপু ক্যানিং বাজারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে টাটকা দেখে কয়েকটা ইলিশ মাছ নিয়ে নেবো নাকি,তোর বৌদিরা রসিয়ে কষিয়ে রান্না করে দেবে তোর জন্যে,বড় মামা মেজো জেঠুকে বলে জানো প্রলয় এই ওর বৌদিদের আশকারা আর আদরে এই তপুটা দিনকে দিন বেয়াকেল্ল হয়ে যাচ্ছে আর সঙ্গে আছে এই বিচ্ছুর দল,ছোট মামা যা বলে তাতেই নাচে,আমরা অপরাধীদের মতো মুখ করে বসে থাকলাম,বড় মামা বলে এবার কোলকাতায় যাওয়ার পর তোর এই কথায় কথায় ট্যুর করা আর বাচ্চাগুলোকে বিপদে ফেলা বার করছি,তোর ট্যুর করাই বন্ধ করে দেবো,ছোট মামা চুপচাপ করুন মুখ করে বসে থাকে,আমরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে বলা বলি করি এই ছোট মামার ট্যুরে যাওয়া বন্ধ যদি ক্ষনস্থায়ী হয় তাহলে ঠিক আছে কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হলে আমরাই সব চেয়ে বেশী কষ্ট পাবো,ছোট মামা ছাড়া আর কে আমাদের বেড়াতে নিয়ে যাবে,মৌ হালকা চালে বলে ওসব নিয়ে কেউ টেনশন করিসনা,জানিস তো ছোট মামাকে আটকে রাখার ক্ষমতা হয়তো ভগবানের হাতেও নেই,আমরা সবাই বললাম তা যা বলেছিস।আমরা রাতে যখন বাড়িতে এসে ঢুকলাম তখন মা,কাকী,জেঠিমাদের কাছে আমরাই হলাম সব নষ্টের গোড়া,আমরা আর কোন কথা না বাড়িয়ে ফ্রেশ হয়ে খাবার খেয়ে শুতে চলে গেলাম।