Tuesday, September 16, 2025

ভানগড়ে প্ল্যানচেট -- আশীষ কুমার রায়

ভানগড়ে প্ল্যানচেট
আশীষ কুমার রায়
১৬/০৯/২০২৫
এখন আমাদের গরমের ছুটি চলছে তাই বাড়ির বড়রা বলাবলি করছিলো যে আমাদের সবাইকে এই রবিবার মামা বাড়ি দিয়ে আসবে। জেঠু বললো ঠিকই পড়াশোনার চাপে ওদের অনেক দিন হলো কোথাও যাওয়া হয়না,যাক ছুটিতে  কদিন না হয় ওখানে কাটিয়ে আসুক। শুনে তো আমরা সবাই আহ্লাদে আটখানা। 
সবে দুপুরের খাওয়ার খেয়ে আমরা কচিকাঁচার দল চিলেকোঠার ঘরে বরাবরের মত জড়ো হলাম। সবার মনে আনন্দ, আমরা প্ল্যান করছি মামা বাড়িতে গিয়ে কি কি করবো। এমন সময় দেখি ধূমকেতুর মতন ছোট মামা এসে  হাজির। 
দেখি ছোট মামার হাতে একটা খাম আর ছোট মামা মুচকি মুচকি হাসছে, ছোট মামা আসায় আমাদের যেমন আনন্দ হলো, তেমনি ছোট মামার মুচকি হাসি দেখে প্রত্যেকের মনে চাঁপা উৎেজনা হলো, উৎেজনা বলাটা ভুল বলা হবে, আসলে সবার মনে দেখা দিলো এক অজানা ভয়। 
ছোট মামাকে তো আমরা হাড়ে হাড়ে চিনি আবার নিশ্চিত ওনার মস্তিকে কোনো পরিকল্পনা এসেছে যেটার জন্যে হয়তো আবার কোনও অঘটন ঘটতে চলেছে। ছোট মামা আমায় বললো যা আগে নীচে গিয়ে আমার জন্য চা, জলখাবারের ব্যাবস্থা কর, তোদের জন্য অপেক্ষা করছে একটা বিশাল চমক। 
আমরা একে অপরের দিকে চাওয়া চাই করলাম, আমি নীচে চলে গেলাম মা, জেঠিমাকে  খবর দিতে। মা ছোট মামার এই ছুটির মধ্যে আসায় বেশ ভীতসন্ত্রস্ত হলো, জেঠিমাকে বললো দেখো বড়দি নির্ঘাত তপুর মাথায় কোন উদ্ভট বুদ্ধি এসেছে। জেঠিমা বললো তুই আগে থেকেই বড় অস্থির হোস, দেখ হয়তো ওদের নিয়ে যেতেই এসেছে,শুনে মা বলে,শোন দিদি তপু তোমার নিজের ভাই হলে কি হবে ওকে আমি তোমার চেয়ে ঢের বেশি চিনি।
তোমরা ভাবছো নিশ্চয়ই তপু আবার কে,তপু আমাদের ছোট মামার নাম, পুরো নাম  তপব্রত লাহিড়ী,বড়রা সবাই ছোট মামাকে তপু বলেই ডাকে। 
কোনমতে ছোট মামার চা জলখাবারের পাট চুকল,আমরা সবাই অধীর আগ্রহে ছোট মামার চমকের অপেক্ষায় আছি। 
ছোট মামা এবার পাশে রাখা খামটা খুললো আর বের করলো সাতটা  কোলকাতা স্টেশন থেকে জয়পুর যাওয়ার আগামী বৃহস্পতিবারের অনন্যা এক্সপ্রেসের টিকিট, বাবলু বলে তবে কি এবার আমরা জয়পুর ঘুড়তে যাবো কিন্তু একটা এক্সট্রা টিকিট দেখছি এটা কার জন্য ছোট মামা,আমরা তো  ছয়জন, মানে তুমি আমি, বাবুন,মৌ,তুলি আর বাবাই। 
একটু মুচকি হেসে ছোট মামা বললো ধৈর্য্য ধর সময় মতন দেখতে পাবি। আমি বললাম জয়পুর দারুন জায়গা,পিঙ্ক সিটি,ওখানে অনেক কিছু দেখার আছে যেমন হাওয়া মহল, নাহারগড় দুর্গ,জল মহল,অমর জওয়ান জ্যোতি আরও কত দর্শনীয় জায়গা। 
ছোট মামা বলে আরে থাম থাম আমরা জয়পুর যাচ্ছি ঠিকই তবে জয়পুরে আমরা থাকবো না, সেখান থেকে আমরা যাবো ভানগড় দুর্গ মানে যেটা দিনের বেলায় মনোরম স্থান আর রাতে ভুতুড়ে বাড়ি, তোরা জানিস রাত নামার পর সাথে সাথে দূর্গের আশেপাশে বসবাসকারী গ্রামবাসীদের
 আর্তনাদ শোনা যায়। ছোট মামার ভুতের কথা শোনার পর আমাদের তো সবার আত্মারাম খাঁচা।
বাড়ির বড়রা সবাই শোনার পর বাগড়া দিলো, সবাই বলে জঙ্গল, পাহাড়, নদী সব জায়গায় কান্ড বাধিয়ে এবার ভুতের সাথে মস্করা করে সবকটা অকালে মরবি। আমরা সবাই বুঝিয়ে সুঝিয়ে অনেক কাকুতিমিনতি করে বড়দের রাজি করলাম।
আমাদের ট্রেন ছিলো কোলকাতা স্টেশন থেকে দুপুর একটা বেজে দশ মিনিটে, আমরা অনেক আগেই পৌঁছে গেছি, প্ল্যাটফর্মে ট্রেন আসার পর আমরা আমাদের কোচে উঠে যে যার সিটে বসলাম। ট্রেন ছাড়ার ঠিক দু মিনিট আগে এক কাপালিক টাইপের লোক আমাদের পাশে এসে বসলেন, ওনার হাতে সুটকেস এর সাথে ছিল একটা অপরিস্কার বড় পুঁটলি। আমরা সবাই হকচকিয়ে উঠলাম, আমি কিছু বলে ওঠার আগেই ভদ্রলোক ছোট মামাকে বললেন, রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম ছিল তাই পৌছতে দেরী হল, ছোট মামা বললো আরে বাবাজি আমি তো ভাবলাম আপনি হয়তো ট্রেনটা মিস করবেন,শুনে ভদ্রলোক একগাল হেসে বললেন যখন ওদের ডাক শুনতে পেয়েছি তখন ট্রেন মিস করি কিভাবে।আমরা অবাক হয়ে গেলাম আমরা তো কেউ ওনাকে ডাকিনি। 
এবার ছোট মামা নড়েচড়ে বসলো,প্রথমেই আমাদের সাথে ওনার পরিচয় করিয়ে দিলো, ছোট মামা বললো শোন উনি হচ্ছেন একজন বিখ্যাত তান্ত্রিক ভোলানাথ আচার্য মহাশয়, উনি বহু বছর কামাক্ষায় বসে শব সাধনা ও শ্মশান সাধনা করেছেন, উনি তন্ত্র সাধনায় মাধ্যমে ভূত বা প্রেতাত্মাদের বশ করা বা তাদের থেকে সুরক্ষা পাওয়ায় পারদর্শী।এরপর ছোট মামা ওনাকে বলে এরা হলো আমার ভাগ্না আর ভাগ্নি,আমাদের প্রত্যেকের সাথে আলাদা আলাদা করে পরিচয় করালো। 
এবার ছোট মামা আমাদের আসল উদ্দেশ্য জানাল, ছোট মামা বললো শোন আমার এক বন্ধুর একটা পুরনো বাড়ি আছে  রাজস্থানের আলওয়ার জেলার রাজগড় পৌরসভায়  ভানগড় গ্রামে,ওর বাড়িটা ওই দূর্গের কাছেই, এখন অবশ্য ওখানে ওদের কেউই থাকে না তবে আমার বন্ধু লোক দিয়ে বাড়িটা পরিস্কার করিয়ে আমাদের ওখানে থাকার বন্দোবস্ত করে রেখেছে।ভানুমতী বলে একটি মেয়ে আমাদের জন্য রান্নাবান্না করবে আর আমাদের দেখাশোনা করবে।শোনা যায় এই ভানুমতী তান্ত্রিক সিংঘিয়ার বংশোদ্ভূত,এই সিংঘিয়া ছিলেন রাজকুমারী রন্তবতীর প্রেমে পাগল তবে রাজকুমারী রন্তবতীই তাকে বোল্ডারে পিষে হত্যা করেন।ওনার অভিশাপ ভানগড়কে গ্রাস করে।এটা হলো পুরো ঘটনা এবার শোনা ওখানে ভোলানাথ আচার্য মহাশয়  প্ল্যানচেট করে সিংঘিয়া আর রাজকুমারী রত্নবতীর আত্মাকে আনবেন আর আমরা ওনাদের কাছেই সমস্ত ইতিহাস জানবো, মনে রাখিস ইতিহাসে আমরা একটা পুরানো সত্যকে তুলে ধরবো। যেটা একটা ঐতিহাসিক বিপ্লব। 
আমরা ছোট মামার সব কথা শুনলাম ও বুঝলাম কিন্তু কেউই ঠিক হজম করতে পারলাম না।আমরা সবাই শুধু কথার শেষে ঘাড় নাড়লাম। 
পরদিন বিকেল পাঁচটায় আমরা জয়পুর পৌছলাম,সেদিন আমরা জয়পুরের শতাব্দী নগরে একটা হোটেলে উঠলাম। শনিবার আমরা সকাল নটার সময় একটা গাড়ি ভাড়া করে ভানগড়ে এগারোটা নাগাদ পৌছলাম।
ওখানে ছোট মামার বন্ধুর বাড়িতে পৌঁছে দেখি ভানুমতী আমাদের জন্য লাল মাস বানিয়ে রেখেছে,আমরা সবাই ফ্রেশ হয়ে খেতে বসলাম,দেখলাম মাঠানিয়া লাল লঙ্কা দিয়ে ভানুমতী দারুন সুস্বাদু লাল মাস মানে মশলাদার মটন কারি বানিয়েছে। ভানুমতী আমাদের বললো রাতে আমাদের বুনো খরগোশ রান্না করে খাওয়াবে।
ছোট মামা বললো আজ আমরা সবাই ক্লান্ত তাই বিশ্রাম করি। কাল আমরা ভানগড় দূর্গে যাবো তারপর আমরা আলওয়ারের আরাবলি পাহাড়ের কোলে ভানগড় দুর্গের চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখবো।সোমবার আমরা ভানগড়ে বেশ কিছু প্রাচীন মন্দির রয়েছে, যা এখানকার আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বোঝায় সেগুলো ঘুড়ে দেখবো।দেখ মঙ্গলবার আমাদের প্রচুর কাজ,সেদিন সকাল থেকে আমাদের প্ল্যানচেটের জন্য যাবতীয় কাজ করতে হবে,সেদিন ভোলানাথ আচার্য মহাশয় রাত বারোটার পর প্ল্যানচেটে বসবেন।শনিবার থেকে সোমবার আমাদের বেশ ঘুড়ে বেড়িয়ে আর ভানুমতীর হাতের সুস্বাদু খাবার খেয়ে ভালো কাটলেও সোমবার রাত থেকে শুরু হল আমাদের সবার মনে ভয়,তুলি ভয়ে ভয়ে আমায় বলে দেখ বাবুনদা জানিনা কাল রাতে আমাদের কপালে কি শনি নাচছে। 
সময় অনুসারে ভোলানাথ আচার্য মহাশয় ঠিক রাত বারোটা বেজে পনেরো মিনিটে প্ল্যানচেটে বসলেন। 
ঘরটি তখন অন্ধকার এবং নিস্তব্ধ,সেখানে শুধু মোমবাতির মৃদু আলো যা ঘরের পরিবেশকে রহস্যময় ও গা ছমছমে করে তুলেছে। এরপর ছোট মামা হালকাভাবে কাস্টারটি স্পর্শ করে মনকে শান্ত রেখে  সিংঘিয়া আর রাজকুমারী রত্নবতীর উপস্থিত আত্মার কাছে প্রশ্ন করা শুরু করলো।এমন সময় সেই অন্ধকার ঘরে হঠাৎ মনে হলো যেন কেউ ছুটে বেড়াচ্ছে কিন্তু কাউকে দেখা যাচ্ছে না।ঘরে হঠাৎ করে বাসনপত্র পড়ে যাওয়ার আওয়াজ পেলাম এছাড়াও ঘরে একটা হিস্ হিস্ শব্দ শুনতে পেলাম, পায়ের উপর মনে হলো কোন কিছু দিয়ে হাল্কা বারি মারছে।ঘরে সবার তখন আত্মারাম খাঁচা অবস্থা,এমন সময় দেখি ভানুমতী কোথা থেকে ছুটে এসে ঘরের আলো জ্বালালো,আলো আসতেই তাকিয়ে দেখি ছোট মামা আর ভোলানাথ আচার্য মহাশয় দুজনেই অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে। ভানুমতী জানালো আসলে রান্নাঘর থেকে কিভাবে দুটো বুনো খরগোশ বেড়িয়ে এসে এই ঘরে ঢুকেছে। এতক্ষনে আমরা বুঝলাম যে এতসময় ধরে ঘরে ওরাই তান্ডব করছিল। ভানুমতী জল নিয়ে এসে ওদের চোখে মুখে ছেটাতে দুজনের জ্ঞান ফিরলো। 
গরম কফি খাওয়ার পর দুজনকে অনেক চাঙ্গা মনে হলো। ছোট মামা এবার তার কাপুরুষতা লুকানোর জন্য আমাদের বললো শোন আসলে কি আমি প্ল্যানচেটের উপর হাত রেখে ওনাদের দুজনের সত্তার সাথে যোগাযোগ করার জন্য ওনাদের নাম মনে মনে  ডাকছিলাম তাই তো ওনাদের উপস্থিতি উপলব্ধি করি আর তোদের কারোর মন স্থির ছিলনা তাই তোরা কিছুই বুঝিসনি। 
তান্ত্রিক ভোলানাথ আচার্য ছোট মামার চেয়ে এক কাঠি উপরে যান, উনি বলেন আমি প্ল্যানচেট শুরু করার পরক্ষণেই বুঝতে পারি যে সিংঘিয়ার অভিশাপে রাজকুমারী রত্নবতী
খরগোশ হয়ে গেছিলেন তাই দেখলে না খরগোশ রুপে সে এখানে উপস্থিত হলো আর ওই যে হিস্ হিস্ শব্দ শুনতে পাচ্ছিলে আসলে সিংঘিয়া ওকে তখন অভিসম্পাত করছিলো আর ওদের দুজনের এই রেষারেষিতে আমাদের প্ল্যানচেট বরবাদ হলো আর ওদের ঝামেলা বন্ধ করতে আমায় অজ্ঞান হবার এই অভিনয় বাধ্য হয়ে করতেই হলো।আমরা সবাই পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছি আর কোনক্রমে হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করছি। 
তুলি হঠাৎ বলে ওঠে সত্যি বাবাজি আপনি মহান,তাহলে আপনার এই সত্য আবিস্কারের কথাটা ঐতিহাসিক মহলে পাঠিয়ে দিচ্ছি,শুনেই তান্ত্রিক ভোলানাথ আচার্য থতমত খেয়ে বলেন আরে এটা কোরো না,আমার আধ্যাত্মিক বল আছে বলে তো আমি ওনাদের এই গোপন রহস্য রাষ্ট্র করে ওনাদের অপমান করতে পারি না,তখন মৌ বলে তাহলে ছোট মামা তোমার নামে পাঠাই, শুনেই ছোট মামা লাফিয়ে উঠে বলে খবরদার ওসব করবিনা, তোরা তো জানিস আমি কোনদিনই যশলোভী নই। 
আমি মুচকি হেসে বলি তোমাদের দুজনের যুক্তিই আমরা বুঝেছি তা ছোট মামা আমাদের ফেরা কবে,ছোট মামা বলে পরশু দিনের ট্রেনে।বাবলু হেসে বলে তবে তো কালকের দিনটা হাতে আছে তাহলে কি বাবাজি কাল আরেকবার প্ল্যানচেটে বসবেন নাকি,শুনেই বিরক্ত হয়ে তান্ত্রিক ভোলানাথ আচার্য মহাশয় বলেন বারবার ওনাদের বিব্রত করা ঠিক নয়। তুলি আমাদের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলে ওনারা কতটা বিব্রত হবেন জানিনা,বাবাজি আরেকবার লেজে গোবরে হবেন এবিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, ওর কথা শুনে আর হাসি চেপে রাখতে না পেরে আমরা সবাই হেসে ফেললাম।

No comments: