Showing posts with label কবিতা. Show all posts
Showing posts with label কবিতা. Show all posts

Friday, March 20, 2026

শিশিরের আর্তনাদ -- মো.ফজলুল হক খান কামাল

শিশিরের  আর্তনাদ 
মো.ফজলুল হক খান কামাল 
১৯.৩.২০২৬
শুনেও শোনে না 
অন্তরের বিশুদ্ধ আকুতি, 
দেখেও দেখে না
পাশে থাকা নিয়তি! 

কবেই দাবানলে পুড়ে গেছে 
আলোকোজ্জ্বল মৌবন,
শিশিরবিন্দু জমে জমে 
সৃষ্টি হবে কি মধুবন? 

চলে যাচ্ছে অভিমানী সময়
আটকাতে পারছে না নিশুতি, 
আরও একটা জিন্দেগী দরকার
পোহাতে ইচ্ছুক অশেষ দুর্গতি। 

না আসুক ফিরে 
হারানো সুখের শ্রাবণ,
চিরতরে কাছে ডাকুক
অদেখা কোনো এক নিদ্রাবন।।

আত্মসম্মান -- শক্তি হালদার

আত্মসম্মান  
শক্তি হালদার 
১৯/০৩/২০২৬ 
আমার বাড়ির ভেতরের উঠোনে,

একটা বিশাল জামগাছ দাঁড়িয়ে আছে ,

তার শিকড় নেমে গেছে গভীর অন্ধকারে।

ঝড় এলে পাতা ঝরে,

ডাল ভাঙে,

তবু কাণ্ডটি নুয়ে পড়ে না। 

মানুষের ভিড় যেন হাটের কোলাহল,

সেখানে দাম ওঠে,

নামে, 

বদলায়।

কিন্তু এই জামগাছ কোনো দরপত্রে ওঠে না,

নিজের ছায়াতেই নিজের আশ্রয় খোঁজে।

কখনও রোদ তাকে পুড়িয়ে দেয়,

কখনও বৃষ্টি তাকে ভিজিয়ে রাখে দীর্ঘক্ষণ,

তবু সে কারোর কাছেই ঋণী নয়,

না আলো বা জলের,

নিজস্ব আকাশেই তার ঋতুর আবর্তন।

শেষে দেখা যায়—

সব হারিয়েও,

সে মাটিতে গেঁথে আছে। 

কারণ আত্মসম্মান আসলে সেই শিকড়,

যা ভাঙে না, মচকায় না  

কেবল আরও গভীরে যায়, আরও গভীরে।

রাগী মাস্টার -- শ্রীরবীন্দ্র নাথ মন্ডল

রাগী মাস্টার
শ্রীরবীন্দ্র নাথ মন্ডল
১৯/৩/২৬
 
চুপচাপ--সব থাক-----নয় কথা একদম,

যদি রাগি--খাবি খাবি--ঘুষি পিঠে দমাদম।

 

কই কই!--খাতা বই---কোথা পেন পেন্সিল?

হেসে হেসে--বেশ ঠেসে--করিস তো কিলবিল।

 

দুই ঘর--ঝর ঝর-----নামতাটা দেখি বল,

ব্যাস বুক!---ধুকপুক--থেমে গেলো কলবল।

 

পড়বি না---শুনবি না--খালি খাবি গবাগব?

পাড়া চরা--খেলা করা--মাছ ধরা ছিপে সব?

 

সব ফেলে---মন ঢেলে--পড়াশুনা আগে চাই

নয় ঝাড়--দমে মার--হাতে রেডি বেত তাই।

 

আজ যাক--বেত থাক--কাল ছুলে দেবো চাম,

আজ থেকে--তেল মেখে---জপ কর রাম রাম।

 

চাই পড়া---আমি কড়া---মাস্টার আছে নাম,

ফেল নয়----চাই জয়--শুনে রাখ যতো ভাম।

 

আজ তবে--যা না সবে--ছুটি দিনু পড়া ইতি,

কাল ভোরে--পড়া করে---আসবিরে যথারীতি।

 

আছে শোনা---কথাখানা?রাখ মনে গেঁথে ঠিক,

পড়াখানা----চাই টানা----নইলেই কুঁজো পিঠ।।

কবিতা -- স্বপন বিশ্বাস

কবিতা
স্বপন বিশ্বাস 
২০/৩/২০২৬
কবিতায় দেয় না খাবার
দেয় না ঘরের চাল 
দেয় শুধু উপবাস আর 
বউয়ের গালাগাল।

সবাই করে হাসাহাসি 
পাগল ছাগল বলে, 
ওরে কবি, তখনো তুই 
নিজেই থাকিস ভুলে। 

পাওনাদার যখন আসে 
আড়ালে সে থাকে, 
ঘরের কোণে লুকিয়ে থেকে 
মৃত্যুকে সে ডাকে। 

গালাগালি আর বকাঝকা 
ঘাড় ধাক্কা কত, 
সন্তানেরা লুকিয়ে থাকে 
শাবক পাখির মত।

আবার বসি আবার হাসি 
লিখি মনের গান 
এমনি করে চোখের জলে 
হয়তো যাবে প্রাণ। 

যাহা কিছু পড়েছিলাম 
সারা জীবন ধরে, 
কাব্যে ছন্দে রেখে গেলাম 
আমার ভাঙ্গা ঘরে।

Thursday, March 19, 2026

সেদিন ছিল চৈত্র মাস -- অরুণ কুমার মহাপাত্র

সেদিন ছিল চৈত্র মাস
অরুণ কুমার মহাপাত্র 
১৮/০৩/২০২৬
ডালে ডালে ফুটে রয়েছে কৃষ্ণচূড়া...
আকাশে আফিম ভরা চৈতি মেঘ আর 
মাতালের মতো দু এক ফোঁটা বৃষ্টি !!
পৃথিবী যেন এক নষ্ট নীড়...
গান গেয়ে ওঠে সারা অঙ্গ...  ।
পাহাড়ের চূড়া যোগান দেয় কামকেলির 
আগুন কণা জলজ বাসনা...

নিঃসাড়ে শুয়ে থাকা মজা নদী
জেগে ওঠে...
রুদ্ধ নদীর বুকে চুম্বন আঁকে 
জ্যোৎস্নার মায়া.... ।
জ্যোৎস্নার আভা ছুঁয়ে যায়
প্রেমের ইচ্ছা...
হ্যাঁচকা টানে সরে যায় গতকাল....
ভেঙে পড়ে নৌকা... ।
রয়ে যায় পাথরে জলের দাগ... ।

প্রহর শেষের আলোয় সে দিন
ছিল চৈত্র মাস... ছিল আমার 
সর্বনাশ... ।



Friday, March 13, 2026

ফাল্গুন -- অভিজিৎ বড়ুয়া অভি

ফাল্গুন 
অভিজিৎ বড়ুয়া অভি
১২/০৩/২৬
রিক্সা চলছে, মন্থর তার গতি,
ক্লান্ত শীর্ণ চালক, ঘামে ভেজা,
নীলা তুমি পাশে, এলো খোঁপা,
তবুও দুই একটি চুল এসে স্পর্শ করে যায়।
ফাল্গুন কি ভালোবাসার মাস?
ফাল্গুনের বাতাসে আছে মুগ্ধতার সুর
শীতলতা বা উষ্ণতা, যেমন তুমি।

তোমার সেই রূপ রস সুবাস,
এ কোন সাজের বা সুগন্ধির নয়,
তোমার দেহে যেন আছে এক মাতাল করা গন্ধ 
বা শিহরণ , স্পর্শ সুখ। সরলতা, সাচ্ছন্দ, শান্তি।
তোমার  রক্তাভগৌরপদ্মসম্ভব গাত্র বর্ণের মুগ্ধতা।

আমি জানি তুমি আমাকে লক্ষ্য করছো,
ঠোঁটের সেই দুষ্ট হাসি আমি বুঝি,
তুমি জানো এই নীরবতা আসলে অব্যক্ত কথা,
তুমি শুনতে পাও বুকে মাঝে আমার জমে থাকা কথা।

আচ্ছা, এখনো কি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই পথ আছে?
পাহাড়ের মাঝে, দুই ধারে গাছের সারি,
কোকিল যুবার কুহুতান, কে বলে কোকিল শুধু
বসন্তে ডাকে? মিলনের তাড়নায় সে সব ঋতুতে কুহুরে।
এখনো কি কোন যুব যুবা শ্রাবণের অঝোর ধারায় ভিজে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে, হাতে হাত ধরে পথ চলে? 

সেই ট্রেন কি এখনো চলে, অনেক যুবা যুবতীর উচ্ছ্বাস,
বন্ধুত্ব, প্রেম, হারানোর কত কথা। রাজনীতি বা সংস্কৃতি,
এখনো কি সেই ডাকঘর আছে? তুমি লিখতে চিঠি, 
মেখে দিতে সুবাস, যা তেরো নদী পেরিয়ে কোন এক যুবকের হতো প্রতীক্ষায় অবসান। আবেগ, ভাললাগা।
বা সেই ডাকবক্স, প্রতিদিন তুমি অধীর হয়ে খুঁজতে প্রতিউত্তর। কোন যুবকের ভালোবাসার চুম্বন। 

পাশাপাশি চলছি, ভাবছি, কিন্ত দুজনে নিশ্চুপ। তোমার সেই হাসি, আড়চোখে দেখা। কাছ ঘেঁষে বসা।
হঠাৎই আমার হাত নিলে, নিজের হাতে। সেই স্পর্শ, আবেগ, উষ্ণতা। একটু সংকোচ হলো। সব বদলে গেছে।
তোমার আমার কালো চুল এখন সাদা হয়েছে। যে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন বিভোর হয়ে, দূরে চলে গেছি দু'জন, আজ প্রতিষ্ঠা এসেছে, হারিয়েছে সময়। জীবন সায়াহ্ন।

ঐ দেখা যায় পথের শেষ। গাড়ি রেখে রিকশা চড়তে চেয়েছিলে। আমার সাদা বড় দামী গাড়ি যেনো আজ ব্যঙ্গ করছে। যেনো অহং কে নির্লজ্জ ভাবে ব্যক্ত করছে। আর তোমার ছোট লাল গাড়ি। শান্ত, স্নিগ্ধ। আচ্ছা সাদা রঙ কি শান্তির প্রতীক না বৈধব্য বা বিচ্ছেদের। আর লাল রঙ? সংসার ত্যাগের মহিমান্বিত রঙ, সংসার ত্যাগী সন্ন্যাসীর। শান্তির রূপ। যেমন বুদ্ধ। মৈত্রী, করুণা, মুদিতা, উপেক্ষা। 

রিকশার থেকে নামলে, হাত ধরলে, বললে, 'কিছু বলবে?' আমি নিশ্চুপ, বহু বছর আগে, 
যেভাবে তোমার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছি।
 হাত ছাড়িয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম, 
বললাম, 'ড্রাইভার চলো'। আরো দ্রুত চলো, 
আমি সেই বিদায় স্মরণ রাখতে চাইনি, চাইনা। 
পেছনে ফিরে দেখতে চাইনা সেই কষ্ট ভরা আঁখি। 
আমি কি তবে পালাচ্ছি। প্রতিষ্ঠা ধন সম্পদের জন্য 
যে ছুটে চলতে, প্রেম থেকে পালিয়েছি, 
এখনো সব পাওয়ার মাঝেও হেরে যাচ্ছি। আমিতো জিততে চেয়েছি। সব পাওয়ার মাঝে। 
নীলা আমি হেরে গেছি। আমি প্রেম, আবেগ, ভালোবাসার ত্যাগ বুঝিনি।

Tuesday, March 10, 2026

অনুপস্থিতির স্থাপত্য --কাজল মুখোপাধ্যায়

অনুপস্থিতির স্থাপত্য
কাজল মুখোপাধ্যায় 
১০ই মার্চ,২০২৬
কখনও হঠাৎ হাত ফাঁকা হয়ে যায়
যেন জীবনের টেবিল থেকে
নিঃশব্দে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে
একটি বহুদিনের পরিচিত ভার।

ঘর তখনও একই থাকে
দেয়াল, জানালা, আলোর অভ্যাস ,অপরিবর্তিত,
তবু বাতাসের ভেতর
অর্থের বিন্যাস ধীরে সরে যায়।

আমরা দাঁড়িয়ে থাকি
সেই অনুপস্থিতির সামনে
যেখানে একটু আগে ছিল
অভ্যাসের নীরব আশ্রয়।

কিছু বিদায়
অদৃশ্য নির্মাণের মতো
যেখানে অচেনা কোনো স্পর্শ
আমাদের হাত হালকা করে দেয়।

আর তখনই বোঝা যায়
শূন্য হাতই নতুন দিগন্তের মানচিত্র।

অসমাপ্ত গ্লানি -- সীমান্ত পথিক

অসমাপ্ত গ্লানি
সীমান্ত পথিক 
 ০৯/০৩/২০২৬
সম্মান করতে করতে আমি অসহায়,
জানিনা কোথায় শেষ—
তবু করে করে নিজে ছোট হই,
ভাবি একদিন শেষ হবে।

না, পাইনি এখনো সেই সকাল,
অপমানের ছায়া ঘিরে থাকে;
মনের ভেতর জমে থাকা কথা
ঠোঁটের কাছে গিয়েও থেমে যায় বারবার ।

যারা কাছে এসে দূরে সরে যায়,
তাদের জন্যই নিজেকে ভাঙি—
ভালো থাকুক সবাই ভেবে,
নিজেকেই বারবার হারা মানি।

তবু আশা রাখি, কোথাও একটা আলো
আমার জন্য জ্বলে আছে—
কোনো একদিন নিজের মতো করে
আমি আবার দাঁড়াবো সবার পাশে।

Sunday, March 8, 2026

নারী -- বনানী সাহা

 নারী
 বনানী সাহা 
০৮-০৩-২০২৬
পুরুষ তোমার স্পর্ধা মেপেছে শুধু --
দমননীতি, শোষণনীতি, অত্যাচারের নির্মমতা যেন তৈরি করেছে তোমারই জন্য !
ঘোমটা কিংবা বোরখার সৃষ্টি হয়েছে কেন ?কার জন্য? কখনো ভেবেছ কী?
না নারীর পর্দাপ্রথা একান্ত প্রয়োজন ছিল!
পুরুষের সমকক্ষ হবে কেন নারী?

পায়ের মলের ছমছম আওয়াজ বলছে শোনো---- বন্দিনী তুমি নারী; পরিমিত স্থানে বিচরণ কারিনী।
শাড়ির আঁচলে সংসারের চাবি ;পরিবারের সকলের ভার---
 উদয়াস্ত পরিশ্রম সবই রইল বাধা তোমার জন্য।
নাকি তোমাকে বাঁধতে---   কে জানে?

পুরুষের জন্য তো আছে জলসাঘর মনোরঞ্জনের প্রয়োজন বোধে ।
শুধু--- তোমার বাধা পাখির মতো উড়ান ভরতে!
যখন তুমি স্বাধীনতার নিশান উড়িয়ে দেখাতে চাও তুমি পুরুষের থেকে কোথাও কম নও --
সমকক্ষ হবার মতো তোমার জ্ঞান, বিজ্ঞান, শক্তি, ক্ষমতা সবই আছে ।
ওদের পৌরুষে লেগেছে!
স্বেচছাচারিনী ,কুলটা আরো কতো কি নামে তোমায় ডেকেছে!

প্রতিঘরের দেয়ালে এখনো তোমার কষ্ট ,কান্না  আর আঘাতের শব্দ লেগে।
সতীত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারে বারে-- 
সেই রামায়ণের কাল থেকে সীতার আঁচল ছুঁয়ে। 
অগ্নি পরীক্ষা দিতে হয়েছে ।
আবার সেই পুরুষই তোমায় টেনে এনেছে পতিতালয়ে !

তুমি মা ,মেয়ে ,স্ত্রী ,বোন হয়ে  পুরুষের পাশে থাকতে জানো।
এটাও ভুলে যেয়ো না প্রয়োজনে ঝাঁসিররানী হয়ে লড়তেও  জানো। 
তোমার সেবা ধর্ম যেমন পৃথিবী  রাখে সবুজ ; পরিবার রাখে মমতায় ধরে।
তেজস্বিনী হয়ে বুকে আগুন লালল করতে জানো।
সেই আগুনে জগত আলো করতে জানো। 
সেই আগুন তোমায় একদিন রাষ্ট্রপ্রধান দ্রৌপদী মুর্মু, মহাকাশ বিজয়ীনী সুনীতা উইলিয়ামস কিংবা বিশ্বজয়ী হরমনপ্রীত করও  বানাতে পারে!

 কখনো লক্ষ্য বিচ্যুত হয়ো না।
কক্ষচ্যুত ধূমকেতুর মতো---
 জ্বলে পুড়ে হারিয়ে যেয়ো না।
নিজের শক্তিকে চেনো।
 নিজেকে ছেয়ে যেতে দাও বাতাসে। উড়তে দাও নীল আকাশে। 
স্বপ্নগুলোর অপমৃত্যু কিছুতেই মেনে নিয়ো না।
কখনো নিজের কাছে হেরে যেয়ো না। 

পুরুষ মানুষ হয় যদি নারীও মানুষ নয় কেন?
অন্যের অবহেলায় নারীত্বের মৃত্যু হয় না ,নারী শক্তির ক্ষয় হয় না --
হয়, নিজের প্রতি নিজের অবহেলায়
মনে রেখো ।

 

Friday, March 6, 2026

ঘুমের আগে -- কাজল মুখোপাধ্যায়

ঘুমের আগে
কাজল মুখোপাধ্যায় 
৪ইমার্চ,' ২৬
আর একটা নতুন দিনের সকাল। সকালের ব্রেকফাস্ট চা খেয়ে অনির্বাণ তৈরি হয়ে গেল বেরোনোর জন্য।মায়া রান্নাঘরে ছিল,অনির্বাণ ব্যাগে একটা জলের বোতল, ডায়রি , পেন আর চশমার খাপটা নিয়েছিল, মায়াকে আলাদা করে বলার ছিল না, সে তো জানতই ।শুধু যাওয়ার আগে অনির্বাণবলল, 'আমি আসছি'।
মায়া জিজ্ঞেস করেছিল, 'ট্রেন কটায়?'
'ন’টা পনেরো।'
'দুপুরে ফিরবে?'
অনির্বাণ একটু থেমে বলেছিল,
চেষ্টা করব।
এই “চেষ্টা করব”-এর মধ্যে কোনও অনিশ্চয়তা ছিল না,ছিল শুধু বাস্তব।
স্টেশন থেকে যখন সে বেরোল,রাস্তাটা কিন্তু তার চেনা ছিল না।
মোবাইলটা পকেট থেকে বের করে অনির্বাণ মেয়েটিকে ফোন করল, মেয়েটি অনির্বাণকে স্কুলের পথনির্দেশ পরিষ্কার করে জানিয়ে দিল ফোনে।
আজ আর নতুন জায়গায় যেতে অনির্বাণের অস্বস্তি লাগছিল না, সেটা কাল রাতেই চলে গেছে।
আজ কেবল গন্তব্যস্থলে যাওয়া, মেয়েটার দেওয়া দিক নির্দেশ মত।
স্কুলটা ছোটো, সামনে সাইনবোর্ডের স্কুলের নাম লেখা,কয়েকটা ঘর, মাঝখানে উঠোন। মেয়েটি স্কুলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা, অনির্বাণ মেয়েটিকে দেখে আন্দাজ করেছিল, সামনে গিয়ে পরিচয় দিতে মেয়েটি অনির্বাণকে হাতজোড় করে নমস্কার করল, তারপর উচ্ছসিত হয়ে বলল ,'আপনি এসেছেন '? এই কথাগুলোর মধ্যে বিস্ময় ছিল না, ছিল স্বস্তি।
অনির্বাণকে লাইব্রেরী ঘরের দিকে নিয়ে গেল মেয়েটি।লাইব্রেরি ঘরের একদিকে একটা বইয়ের আলমারি,তার মধ্যে কয়েকটা নতুন-পুরোনো বই,কিছু পাঠ্যবই, কিছু গল্প, প্রবন্ধের বই।
'এইটা তোমাদের লাইব্রেরি?' অনির্বাণ জিজ্ঞাসা করল। 
মেয়েটি বলল, 'হ্যাঁ আগেও ছিল ,তবে মাঝে বন্ধ ছিল অনেকদিন ,এখন আবার শুরু করার চেষ্টা হচ্ছে'।
ঘরের মধ্যে জনা বিশেক ছোটো ছোটো ছেলে মেয়ে বেঞ্চে বসে ছিল, কয়েকজন নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল, কয়েকজন আমার মন দিয়ে বই পড়ছিল।
অনির্বাণকে ওই ঘরে প্রবেশ করতে দেখে ,কৌতূহলে তার দিকে তাকিয়ে থাকল তারা।
মেয়েটি ধীরস্বরে বলল,'ওরা জানে না আপনি কে।'
অনির্বাণ হালকা হেসে বলল,'আমিও ঠিক জানি না।'
অনির্বাণ তাদের সামনে চেয়ারটায় বসে পড়ল,তারপর বলল,তোমরা কী কী বই পড়তে ভালোবাসো?
প্রথমে কেউ কোনো উত্তর দিল না, এরপর একটা ছোট মেয়ে একটু আস্তে করে বলল, 'গল্পের।'
এই শব্দটার মধ্যে দিয়ে ঘরের ক্ষনিকের নীরবতাটা যেন সরে গেল। অনির্বাণ বলল,'আমিও গল্পের বই পড়তে ভালোবাসি'।
এরপর অনির্বাণ নিজের স্কুল জীবনের কথা কিছু কিছু বলল,নিজের স্কুল লাইব্রেরিতে  গিয়ে পড়াশোনার কথা বলল , ছোটবেলায় কীভাবে গল্পের বই খুলে গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়ত, তখন খেলা বা খাওয়ার কথাও মনে থাকতো না তার ।ছেলে মেয়েগুলো মন দিয়ে অনির্বাণেরকথা শুনছিল, তারা অনির্বাণের কথায় লাইব্রেরী আর গল্পের বই পড়াসম্বন্ধে বেশ উৎসাহিত হয়ে পড়েছিল, এটা তাদের চোখ মুখ দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছিল।
মেয়েটি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল,মেয়েটি বুঝতে পারছি না লাইব্রেরী সম্বন্ধে তার পরিকল্পনা সফল হতে  চলেছে।
কিছুক্ষণ পরে ওই স্কুলের প্রধানশিক্ষক এসে ওই ঘরে ঢুকলেন।
মেয়েটির পাশে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন অনির্বাণের কথা শুনছিলেন তিনি,তারপর মেয়েটিকে বললেন,'এই ভদ্রলোক কে?মেয়েটি একটু ইতস্তত করে বলল,'উনি… আজ এসেছেন… বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলতে লাইব্রেরীর বিষয়ে, আমিই ওনাকে ডেকেছি,'
প্রধান শিক্ষক অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আমি এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক,আপনি কি স্কুল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে স্কুল লাইব্রেরীতে এসেছেন?'
অনির্মাণ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। 
বুঝতে পারল ,এই প্রশ্নটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তাই অনির্বাণ প্রশ্নটা শুনে একটু চুপ করে থাকল,তারপর বলল,'না।'
প্রধান শিক্ষক বললেন,'এইসব ব্যাপার এভাবে করা যায় না।'
অনির্বাণ মাথা নেড়ে বলল,'আমি ঠিক জানি না,তবে আপনি বললে আমি এখনই চলে যাব এখান থেকে'।
প্রধান শিক্ষক কিছু একটা ভাবলেন,তারপর ওই ঘরের বেঞ্চে বসা ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের দিকে তাকালেন।
এরপর বললেন, 'না না, আজ থাকুন,আপনি যে রকম ভাবে ওদের সাথে কথা বলছেন সেটাই করুন'।
এই কথাটা কোনও অনুমতি নয়,কিন্তু অনির্বাণ বুঝতে পারল,এই “আজ থাকুন” মানে অন্তত আজকের দিনের জন্য অনুমতি পাওয়া।
দুপুরে ফেরার সময় মেয়েটি স্কুলের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল অনির্বাণকে।
'আজকের পরে আপনি আবার আসবেন তো?'
এই প্রশ্নে তেমন কোনও প্রত্যাশা ছিল না,শুধু জানতে চাওয়া।
অনির্বাণ একটু ভেবে বলল,'হ্যাঁ, যদি প্রধান শিক্ষক অনুমতি দেন , তাহলে আমাকে জানিও'।
এই “হ্যাঁ” বলার সময় সে নিজেই বুঝল,এটা শুধুই কথার কথা।
ফেরার সময় স্টেশনের পাশের একটা হোটেলে ঢুকে অনির্বাণ দুপুরের খাবার খেয়ে নিল।
ফেরার ট্রেনে বসে তার মনে হল,আজ সে কোনও বড় কাজ করেনি,কাউকে বিশেষ সহযোগিতা করেনি
কোনও নতুন ব্যবস্থা তৈরি করেনি।
কিন্তু আজ সে নিজের একটা ভুল ধারণা ভেঙেছে, অবসরের পরে সে এতদিন ভেবেছিল,তার সব দরকার ফুরিয়ে গেছে,আজ সেই ভাবনাটার অনেকটাই বদলে গেল।
সন্ধ্যায় বাড়ি ঢুকতে মায়া বলল, 'সারাদিন কিছু খেয়েছো'?
অনির্বাণ বলল ,'হ্যাঁ হোটেলে খেয়ে নিয়েছি',এরপর বলল,'আজ লাইব্রেরীতে গিয়ে ছোটোছোটো ছেলেমেয়েদের সাথে কথা বলে ভালো লাগল।
মায়া মাথা নেড়ে বলল,'আমি বুঝতে পেরেছি।'
অনির্বাণ একটু হেসে ফেলল,'কী করে?'
মায়া কাপে চা ঢালতে ঢালতে বলল,'আজ তোমার মুখের ভাব যেরকম,কাল তেমন ছিল না।'
এই কথাটার ব্যাখ্যা অনির্বাণ জানতে চাইল না,তার দরকারও ছিল না।

রাতে ঘুমোবার আগে সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ বাইরের তাকিয়ে রইল,এই শহরে হাজার হাজার মানুষ কাজ করে,হারে, জেতে, ভুল করে, ফিরে আসে,কিন্তু আজ তার নিজের সাথে একটা ছোটো ঘটনা যেন নিঃশব্দে আলাদা হয়ে গেল,কোনও খবরের কাগজে নয়,কোনও ফলকে নয়,শুধু তার নিজের কাছে ।
এই কারণে, আজকের দিনটা তার কাছে মনে রাখার মত একটা দিন হয়ে রইল, কারণ সে জানে লাইব্রেরীটাতে সহযোগিতা করার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষেরঅনুমতি পাক আর না পাক,ওই স্কুলের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েগুলোর কাছে সে যে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পেরেছিল,এটাই তার আজকের সাফল্য।

Monday, March 2, 2026

চেয়ে নেবো মুক্তি পৃথিবীর কাছে -- অরুণ কুমার মহাপাত্র

চেয়ে নেবো মুক্তি পৃথিবীর কাছে
অরুণ কুমার মহাপাত্র
০১/০৩/২০২৬
জীবনের খেলাঘরে কেটে গেছে সময়...
দেখেছি শৈশব , দেখেছি কৈশোর
এখন দেখছি নুয়ে পড়া বার্ধক্য ।
সবার ভালোর জন্য কেটেছে সময়...
আজ হিসেব কষে সে সব লাভ কি বলো ?
সবাই আত্ম চৈতন্যে বিভোর ... ।
জীবনের সব হিসেবই তো আজ গরমিল ।
আমার 'আমি' বলতে নেই কিছু আর ।
তবুও দিনের শেষে এখনো বন্দী আমি
ভালোবাসার কাছে ।
কখনো সখনো কপর্দকশূন্য ভালোবাসার
দড়ি টানাটানিতে ভালোবাসা মুখ 
থুবড়ে পড়ে  ...
কেউ মনে রাখে না কাউকে  ।
কে কাকে মনে রেখেছে বলো  ?
যে ভালোবাসার জন্যে হৃদয়ে তুফান ওঠে
সেই ভালোবাসা শিথিল হলে 
বাঁধন ছেঁড়ে  ।

ভালোবাসার গল্পগুলো খুঁজতে গিয়ে
দেখি...
আমার ভালোবাসার পৃথিবীটা আজ
বেরসিক অন্ধকারে নিখোঁজ  ।
পৃথিবীর কাছে হাত পেতে নিয়েছি
কত কিছু ।
দিতে পেরেছি তার কতটুকু  ?
পৃথিবীর কাছে ঋণী হয়ে আছি আমি...
এখনো যতটুকু ভালোবাসা দেবার
মত আছে
সবটুকু দিয়ে নিঃশেষ হয়ে চেয়ে নেবো
মুক্তি পৃথিবীর কাছে  ।

Thursday, February 26, 2026

বিজনে

বিজনে 
শিপ্রা বসাক 
২৫/০২/২০২৬
এভাবেই মরে যেতে চাই একটু একটু করে ---
প্রতি দিন, প্রতি ক্ষণে,
এভাবেই দুহাতে তুলে নিতে চাই শিউলি-ফোঁটা ভোর
এভাবেই দুচোখে এঁকে নিতে চাই স্বপ্ন মাখা রোদ ,
এভাবেই পার হয়ে যাবো যুগের পরে যুগ , অবিচল ,
জন্ম থেকে জন্মে ।
           *        *        *        *        *         *
সদ্য কুসুম-ফোঁটা কিশোরীবেলায় আগুনরাঙা মেঘ
শুনিয়েছিল বিরহী যক্ষের কথা 
তারপর কত মেঘ পার হয়ে , ঘুম ঘোরে , স্বপ্নরাজ্যে
ছন্দে ছন্দে পেয়েছিলাম আগমন বার্তা ।

অচেতন তনুমন জানালো প্রবেশ তার 
রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিরায় শিরায় 
আনত চোখ তুলে তাকিয়ে থাকি শুধু 
প্রেম তার , সবটুকু , চিনে নিতে চায়।

একবার পাই, আবার হারাই , জীবন জুড়ে শুধু 
আলো আর ছায়ার খেলা ,
দিনরাত কত পথ , কখনো বন্ধুর , কখনো সমতল
এভাবেই কেটে যায় বেলা ।
             *        *        *        *        *        *
এভাবেই কেটে যাক , বয়ে যাক , তাপসী সময়টুকু 
চিনে নিক আপনার জন ,
এভাবেই কালের খাতায় রঙীন কলম থেকে ঝরে পড়ুক প্রেম ,
এভাবেই উত্তরণের পথে বেঁচে থাক নম্রচোখে না পাওয়া অভিলাষ ,
এভাবেই শূন্য থেকে ক্রমাগত এগিয়ে চলি পূর্ণতার পথে
যত্নে আগলে রেখো সারাটা জীবন।

Saturday, February 21, 2026

বাংলা ভাষার টানে -- সমরেন্দ্রনাথ ঘোষ

বাংলা ভাষার টানে
সমরেন্দ্রনাথ ঘোষ
২১ শে ফেব্রুয়ারী,২০১৬
মাগো তোমার পায়ের পাশে রক্তপলাশ সারি
রক্তঝরা দিনের কথা আমরা ভুলতে পারি?
আকাশ ছিল ফাগুন দিনের খরতাপে ঘেরা
দেশবাসীর আওয়াজ ছিল মায়ের তরে সেরা,
ছিলনা ভয়,ছিল নাকো তাদের পিছুটান
বুকের মাঝে বেজেছিল শাশ্বত এক গান।
মায়ের ভাষা চেয়েছিল যারা কেড়ে নিতে
আত্মত্যাগের লড়াই ছিল মাথা পেতে দিতে।

সালামের সেই রক্তমাখা জামার লাল রঙে
বরকতের শেষ চাহনীর বিদীর্ণ সেই ঢঙে,
ভেঙেছিল সব শৃংখল,সব অন্যায়ের বাঁধ
উঠেছিল নতুন রবি,নতুন আশার চাঁদ।
'মা' বলতে আজও কলজেটা যায় কেঁপে
মমতাময়ীর পরশ পাই মায়ের শব্দ মেপে,
'অ' আমাদের প্রাণের আরাম,'আ' অহংকার
সেরার সেরা আমার ভাষা,আমার প্রাণেস্বর।

বাংলা ভাষা ঠুনকো নয়,প্রাণের কথামালা
বাংলা ভাষা আমার মায়ের নয়নজলের জ্বালা,
বাংলা ভাষা কিষাণ-মাঝির ঘামঝরানো সুর
বাংলা ভাষা বনস্পতি আরাম মেঘ মেদুর।
তাইতো একুশ অমর একুশ বুকের মাঝখানে
তাইতো একুশ আগুন ঝরায় বাংলাভাষীর মনে,
তাইতো একুশ অমর একুশ মায়ের ভালোবাসা
তাইতো একুশ সবার মনে চিরন্তনী আশা।

Thursday, February 12, 2026

ঘুমের আগে -- কাজল মুখোপাধ্যায়

ঘুমের আগে.......
কাজল মুখোপাধ্যায় 
১০ই ফেব্রুয়ারি,'২৬
স্টেশনের বেঞ্চগুলো আগের মতোই আছে।
শুধু তার বসে থাকার ভঙ্গিটা এখন বদলে গেছে।
অনির্বাণ বসে আছে,
হাতের ব্যাগটা দু’পায়ের মাঝখানে রেখে।
কতদিন পরে এই প্ল্যাটফর্মে এল, নিজেই ঠিক মনে করতে পারে না।
রেলের চাকরির সময় এই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো মানেই ছিল তাড়া, হিসেব, হুইসলের সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনে উঠে পড়া।
আজ আর সেসব নেই।
শুধু সময়টা আছে।
অদ্ভুতভাবে আজ সময়টা খুব ভারী।
ট্রেন ঢোকার আগে প্ল্যাটফর্মে যে  নীরবতা নামে,
সে নীরবতাটা ওর কানে এসে লাগে।
মনে হয়,
এই নীরবতার মধ্যেই বোধহয় মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় কথাগুলো লুকিয়ে থাকে।
অনির্বাণ এখন অবসরপ্রাপ্ত।
শব্দটা শুনতে যেমন হালকা লাগে,
জীবনে তেমন নয়।
বাড়িতে সবাই জানে,
ও ভালো আছে।
ভালো থাকার সংজ্ঞাটা অবশ্য কেউ জিজ্ঞেস করে না।
স্ত্রী, মায়া, সকালে উঠে চা বানায়।
খুব নিয়ম করে।
চিনি মাপা, আদা থেঁতো করে দেওয়া, ফুটে ওঠার ঠিক আগেই নামানো, দুধ ছাড়া লিকার চা।
এই নিয়মগুলোই ওদের সংসারের সবচেয়ে পুরোনো ভাষা।
সাইত্রিশ বছরের দাম্পত্যে
অনির্বাণ আর মায়ার মধ্যে কথা কমেছে,
কিন্তু ভুল বোঝাবুঝি বাড়েনি,
এটা বিরল।
মাঝে মাঝে অনির্বাণ নিজেই অবাক হয়,
এতদিন একসঙ্গে থেকে মানুষ কি সত্যিই কাউকে চেনে?
নাকি কেবল অভ্যাসকে ভালোবাসা বলে চালিয়ে দেয়?
আজ মায়া জিজ্ঞেস করেছিল,
“ফিরতে দেরি হবে?”
অনির্বাণ বলেছিল,
“হতে পারে।”
কোথায় যাচ্ছ?
এই প্রশ্নটা এখন আর রুটিনমাফিক কেউ করে না, শুধু কখন ফিরবে আর নিরাপদে ফিরবে কিনা সেই ভাবনাটা!
অনির্বাণ নিজেও ঠিক জানে না।
শুধু জানে,
আজ খুব দরকার ছিল বাড়ির বাইরে বেরোনোর।
ট্রেন ছাড়ে।
একটা জানালার পাশের সিট।
চেনা শহরটা ধীরে ধীরে পেছনে সরে যায়।
অনির্বাণ জানালার কাঁচে নিজের মুখটা দেখতে পায়,
অল্প ঝাপসা,
কিন্তু বয়সটা পরিষ্কার।
এই বয়সে এসে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা বদলায়,
তা শরীর নয়।
ভিতরের গতি আর তাগিদ।
হঠাৎ পাশে বসে থাকা মেয়েটা কথা বলে।
“এই লাইনে কি সব ট্রেনই এত দেরি করে?”
মেয়েটার গলায় কোনো বিরক্তি নেই।
বরং কৌতূহল।
অনির্বাণ একটু চমকে ওঠে।
আজকাল অপরিচিত কেউ কথা বললে,
মানুষ অবাক হয়।
“হ্যাঁ… দেরি তো হয়ই।”
মেয়েটা হালকা হেসে বলে,
“আমার কিন্তু দেরি হওয়ায় ভয় লাগে না।
ভয় লাগে থেমে গেলে।”
এই কথাটুকু খুব সাধারণ মনে হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু অনির্বাণের মনে কথাটা কোথাও যেন একটু হলেও ছাপ ফেলল।
“থেমে গেলে?”
মেয়েটা জানালার দিকে তাকিয়ে বলে,
“হ্যাঁ।
সবাই তো একসময় কোথাও না কোথাও থেমে যায়।
আমি শুধু চাই, থামার আগে পর্যন্ত যেন চলাটা স্বাভাবিক নিয়মে হয়।”
অনির্বাণ চুপ করে থাকে।
কথাটা এত সহজভাবে বলা,
এটাই ওকে অস্বস্তিতে ফেলে।
“আপনি কি কাজ করেন?”
অনির্বাণ জিজ্ঞেস করে।
“করতাম।”
একটু থেমে মেয়েটা বলে,
“ছেড়ে দিয়েছি।”
“কেন?”
“কারণ ওই কাজে আমি আর নিজেকে চিনতে পারছিলাম না।”
এই উত্তরটা অনির্বাণকে অদ্ভুতভাবে ছুঁয়ে যায়।
নিজেকে চিনতে না পারা,
এই বাক্যটা ওর জীবনের অনেক জায়গায় রয়ে গেছে।
মেয়েটার নাম তনুশ্রী।
কলকাতার মেয়ে নয়।
 মফস্বল শহরে থাকে।
নাটকের দল করত।
এখন একাই ছোটো ছোটো  কর্মশালা করে।
“ভবিষ্যৎ কী?”
অনির্বাণ একটু হালকা হেসে জিজ্ঞেস করে।
তনুশ্রী খুব সহজভাবে বলে,
“জানি না।
তবে এটুকু জানি,
ভবিষ্যৎ না জানাটাই এখন আমার সবচেয়ে বাস্তব অবস্থা।”
এই কথার মধ্যে কোনো বড় দর্শন নেই।
তবু অনির্বাণ হঠাৎ অনুভব করে,
সে অনেকদিন অপরিচিত কারও সঙ্গে এমন স্বাভাবিকভাবে কথা বলেনি।
অনির্বাণের তখন মনে হয় মায়ার কথা।
মায়া কোনোদিন নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাবে নি।
তার সব পরিকল্পনার কেন্দ্র ছিল,
সংসার।
মেয়েদের পড়াশোনা।
বাড়ির খরচ।
অনির্বাণের বদলি।
অনির্বাণের ক্যারিয়ারের ওঠানামা।
মায়ার জীবনে অনির্বাণ ছিল পথ।
আর অনির্বাণের জীবনে?
এই প্রশ্নটা ও বহুদিন এড়িয়ে এসেছে।
তনুশ্রী হঠাৎ বলে,
“আপনার কি মনে হয়, মানুষ কি শেষ বয়সে এসে হালকা হতে পারে?”
অনির্বাণ একটু হেসে ফেলে।
“হালকা?”
“হ্যাঁ।
সব দায়িত্ব নামিয়ে রেখে।”
অনির্বাণ খুব ধীরে বলে,
“কিছু দায়িত্ব নামানো যায় না।
নামাতে নেইও।”
তনুশ্রী মাথা নাড়ায়।
“আমি জানি।
কিন্তু দায়িত্ব না নামিয়েও তো মানুষ নিজে থেকে বাঁচতে পারে…
এইটুকুই আমার লড়াই।”
'লড়াই'......।
শব্দটা অনির্বাণের জীবনে নতুন নয়।
তবু আজ শব্দটার মানে বদলে যাচ্ছে।
স্টেশন এসে যায়।
তনুশ্রী নামে।
নামার আগে বলে,
“আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল।”
তারপর একটু থেমে,
“আপনি কিন্তু এখনো থেমে যাননি।
আপনি শুধু একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে আছেন।”
অনির্বাণ কিছু বলতে পারে না।
মেয়েটা নেমে যায়।
ট্রেন আবার চলতে শুরু করে।
অনির্বাণ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।
মনে হয়,
সে আজ কোথাও যাচ্ছে না।
সে আজ কেবল নিজের মনের মধ্যে দিয়ে একটু হাঁটছে।
এই বয়সে এসে
মানুষ যদি নিজেকে নতুন করে চিনতে শুরু করে,
তা কি খুব দেরি হয়ে যায়?
মায়ার মুখটা চোখের সামনে আসে।
চা বানানোর সময় গ্যাসের আঁচ কমানো।
মেয়েদের ফোন এলে গলার স্বর বদলে যাওয়া।
এই ছোটো ছোটো দৃশ্যগুলোই কি আসলে ভালোবাসার সবচেয়ে স্থায়ী ভাষা?
অনির্বাণ হঠাৎ বুঝতে পারে,
ঘুমের আগে তার এখনও অনেকটা পথ চলা বাকি।
এ পথ কোনো স্টেশনের দিকে নয়।
নিজের বোধের দিকে।

সকালের আলোটা মায়ার খুব পছন্দ।
খুব উজ্জ্বল আলো নয়,
একটু ফ্যাকাশে,
একটু ধুলো মেশানো,
বাড়ির সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছটার ডাল গুলোর মধ্যে দিয়েঢুকে পড়ে যে আলো,
ওটাই।
অনির্বাণ চলে গেলে ঘরটা অদ্ভুত রকম নীরব হয়ে যায়।
শব্দ নেই, এমন নয়।
ঘড়ির কাঁটা চলে।
ফ্রিজের ভেতর থেকে হালকা গুঞ্জন আসে।
পাড়ার কুকুরটা দূরে কোথাও ঘেউ ঘেউ করে।
তবু মায়ার মনে হয়,
মানুষ থাকলে ঘরে যে একরকম শব্দ থাকে,
সেটা নেই।
অনির্বাণ বেরোনোর সময় বলেছিল,
“ফিরতে দেরি হতে পারে।”
এই কথাটুকুই।
কোথায় যাবে?
মায়া জানতে চায়নি।
এখন আর জানতে চাওয়া লাগে না।
এই সংসারে অনেক প্রশ্ন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের জায়গা বদলেছে।
আগে প্রশ্ন মানে ছিল,
উদ্বেগ।
এখন প্রশ্ন মানে,
নীরব সম্মান।

চা নামিয়ে রেখে মায়া বারান্দায় এসে দাঁড়ায়।
কাপে ধোঁয়া উঠছে।
একসময় এইরকম ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই
সে নিজের দিনগুলো কাটিয়েছে।
দু’টো ছোট মেয়ে,
একজন সদ্য বদলি হয়ে আসা রেলকর্মী স্বামী,
অচেনা পাড়া,
অচেনা বাজার,
অচেনা ভাষার টান।
তখন সে ভাবেনি,
এই শহরটাই একদিন তার সবচেয়ে পরিচিত হয়ে উঠবে।
মায়া গান শিখত।
কথাটা সে কাউকে বললে এখনো একটু অস্বস্তি হয়।
যেন কোনো অপ্রয়োজনীয় পরিচয়।
বাপের বাড়িতে হারমোনিয়াম ছিল।
তানপুরা ছিল।
রেওয়াজের সময় মা পাশে চুপ করে বসে থাকতেন।
মায়ার গলার স্বর তখন খুব পরিষ্কার ছিল।
শিক্ষক বলতেন,
“তুই চাইলে অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারবি।”
মায়া দূরে যাওয়ার কথা ভাবেনি।
তার সামনে তখন শুধু একটাই ভবিষ্যৎ ছিল,
ভালো মেয়ে,
ভালো বউ,
ভালো সংসার।
সে ভবিষ্যৎকে কখনো অস্বীকার করেনি।

কিন্তু কোনো কোনো দুপুরে,
রান্নাঘরে একা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে,
হঠাৎ নিজের বিবেকের ভেতর থেকে একটা স্বর উঠে আসত,
এই গলাটা কি কেবল ডাকাডাকির জন্যই ছিল?
মেয়েরা বড় হয়ে গেছে।
এখন দু’জনেই দূরে।
ফোনে , ভিডিও কলে কথা হয়।
ছবি আসে।
নাতি–নাতনির হাসি স্ক্রিনে ভাসে।
মায়া হাসে।
কিন্তু ফোন রেখে দিলে,
ঘরটা আবার নিজের পুরোনো আকারে ফিরে আসে।

মায়া হঠাৎ আলমারির নিচের তাকটা খোলে।
অনেকদিন পরে।
একটা পুরোনো কাপড়ের থলে।
ভেতরে তানপুরার মিজরাব।
একটা নোটবুক।
নোটবুকের পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে।
রাগ ভৈরবী।
খাম্বাজ।
ইমন।
হাতের লেখাটা তার নিজের,
কিন্তু যেন অন্য কারও।
এই বয়সে এসে
নিজের পুরোনো হাতের লেখা চিনতে সময় লাগে,
এটা তাকে একটু অবাক করে।
মায়া জানে,
অনির্বাণ কখনো তাকে গান ছাড়তে বলেনি।
সে নিজেই ছেড়ে দিয়েছিল।
এই কথাটা বলা কঠিন।
কারণ দোষ দিলে সবকিছু সহজ হয়।
নিজেকে দায়ী করলে নয়।
অনির্বাণের সঙ্গে তার ঝগড়া খুব একটা হয়নি।
বড় ঝগড়া তো নয়ই।
ছোটখাটো অভিমান ছিল।
কিন্তু সেগুলো এমন কোনো অভিমান নয়,
যা সংসার কাঁপিয়ে দেয়।
বরং ঠিক উল্টো।
এই সম্পর্কটা এতটাই মসৃণ ছিল যে,
কখন কোথায় নিজের মান অভিমানগুলো ফিকে হয়ে গেছে,
সে খেয়াল রাখেনি।
মায়া জানালার ধারে বসে পড়ে।
সামনের রাস্তায় স্কুলবাস যাচ্ছে।
একজন মা ছুটে এসে জানালা দিয়ে বাচ্চার হাতে জলের বোতল দিয়ে গেল।
দৃশ্যটা খুব সাধারণ।
কিন্তু মায়ার বুকের ভেতরে কোথাও যেন কিছু পুরনো স্মৃতিগুলো মনে পড়ে যায।
সে নিজের মেয়েদের এমন করেই স্কুল বাসে উঠিয়ে দিয়েছে কতদিন।
 সেসব করতে করতে একসময় নিজের শখ ইচ্ছে গুলো ভুলে মেরে দিয়েছিল।

হঠাৎ তার মনে পড়ে,
ক’দিন আগে অনির্বাণ বলেছিল,
“তুমি আবার গানের রেওয়াজ করছো শুনেছি।”
মায়া কিছু বলেনি।
হালকা হেসেছিল।
গানটা সে খুব জোরে গায় না।
পাড়ার কেউ শুনবে,
এই লজ্জা এখন আর নেই।
কিন্তু অনির্বাণ শুনলে কী ভাববে,
এই সংকোচটা রয়ে গেছে।
মায়া ধীরে ধীরে তানপুরাটা বের করে আনে।
পুরোনো কাঠের গায়ে ছোট ছোট দাগ।
একটা সময় ছিল,
এই যন্ত্রটার পাশে বসে থাকলেই
নিজেকে ঠিক জায়গায় আছে মনে হতো।
এখন একটু ভয় করে।
এই ভয়টা বয়সের নয়।
নিজেকে আবার ফিরিয়ে আনার ভয়।
সে আলতো করে তারে হাত বুলিয়ে দেয়।
শব্দটা ঠিকমতো ওঠে না।
দু’একটা তার ঢিলা।
মায়া খুব সাবধানে ঠিক করে।
তারপর খুব নিচু গলায়,
একটা ইমন।
সুর ভাঙে।
আবার ধরে।
ভাঙে।
তারপর ধীরে ধীরে ঠিক জায়গাটা খুঁজে নেয়।
মায়ার চোখ ভিজে আসে।
এই কান্না দুঃখের নয়।
এই কান্না অনেকদিন জমে থাকা নিজের কাছে ফিরে পাওয়ার।

সে হঠাৎ থেমে যায়।
দরজার শব্দ।
চাবির আওয়াজ।
অনির্বাণ?
মায়ার মনটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে ওঠে।
সে তানপুরাটা নামিয়ে রাখে।
চোখ মুছে নেয়।
কিন্তু দরজায় কেউ ঢোকে না।
ভুল।
পাশের ফ্ল্যাটে।
মায়া হালকা নিঃশ্বাস ছাড়ে।
নিজের অজান্তেই।

সে বুঝতে পারে,
অনির্বাণের সামনে নিজের এই নতুন ফিরে আসাটা দেখাতে তার এখনও সময় লাগবে।
সব ভালোবাসাই যে একসঙ্গে সাহস হয়ে ওঠে না।
মায়া আবার জানালার দিকে তাকায়।
রাস্তায় আলো একটু বেড়েছে।
তার মনে হয়,
অনির্বাণ আজ ফিরলে
সে তাকে কিছু বলবে না।
শুধু চা বানিয়ে দেবে।
কিন্তু আজ চায়ের পাশে
একটা অন্য নীরবতা থাকবে।
যেটা এতদিন ছিল না।
মায়া জানে,
এই সংসার ভাঙছে না।
কিন্তু এই সংসারের ভেতরে
সে একটু নতুন করে জায়গা বানাচ্ছে।
নিজের জন্য।
আর এই জায়গাটা
কারও থেকে চুরি করা নয়।

দূরে কোথাও ট্রেনের হুইসল শোনা যায়।
মায়া জানে না,
ওই শব্দটা অনির্বাণের ফেরার সংকেত কি না।
কিন্তু শব্দটা আজ আর তার কানে লাগে না।
আজ ওই শব্দটার ভেতরেও
সে নিজের একটা সুর খুঁজে পায়।

Monday, February 9, 2026

রাত্রি যত গভীর হয় -- শ্রীরবীন্দ্র নাথ মন্ডল

রাত্রি যত গভীর হয় 
শ্রীরবীন্দ্র নাথ মন্ডল
৯/২/২৬
রাত্রি যত গভীর হয়---কাল পেঁচাদের ততই বাড়ে বেয়াদপ পরিক্রমা।নিস্তব্দতা হয় থমথমে,কোমাচ্ছন্ন।রাত্রির শরীর হয় আরো কালো।             

রাত্রি যত গভীর হয়------বারগুলো অমৃতে চুমুক দিয়ে ষোড়শীর পেলব ঠোঁটে ভাসতে থাকে চুমের বন্যায়।সঙ্গে থাকে লজ্জাহীন উলঙ্গময় বেল্লিক নৃত্য আর বিদেশী বাদ্য যন্ত্র।বিকৃত রুচির ছন্দহীন তালে তালে ঢুল ঢুল করে হয় দুয়ারী।ব্যাভিচারী উন্মাদ যৌবন তখন  উদ্গ্র তৃষ্ণার সমুদ্রে কাটতে থাকে সাঁতার।      

রাত্রি যত গভীর হয়---- চরতে বেড়ায় যত অনাচার,কদর্য-কীট।হায়নারা শিকারের আশায় মেলে রাখে তাদের ইতর জাল।রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় ঘৃণ্য পশুত্ব।এবং তখন নীতিহীন নির্মমতার পিঠে চরে পরিভ্রমণে শরীরচর্চায় থাকে ব্যস্ত।                         

রাত্রি যত গভীর হয়----বেসুর জামা পোষাক খুলে অন্যায্যতার পাশবিক দানবীয়তাকে আমন্ত্রণ করে ডেকে আনে।তখন বিকৃত হিংস্রতার বিষাক্ত কেউটে বিষ ঢেলে চলে ক্রমাগত।রাত্রিও  তখন দখল হয়ে যায় পিশাচের ভয়ঙ্কর অন্ধকার হারেমে।শুধু শুদ্ধ মনুষত্ব বিরামহীন কাঁদতে থাকে একান্ত শ্মশানে নিভৃত কুঁড়েঘরে।যেখানে সর্বদাই শোকের আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরে প্লাবিত হয় মর্মান্তিকতার দুঃসহ নগরী।।

Thursday, February 5, 2026

নীরব ভাঙন -- শ্যামল মন্ডল

 নীরব ভাঙন
 শ্যামল মন্ডল 
 ০৪/০২/২০২৬
আমি ছিলাম পাথরের মতো স্থির,

দিনের আলো গড়াত আমার গায়ে—

কেউ ডাকেনি, কেউ থামেনি,

নীরবতার ভিতরেই ছিল আমার পরিচয়।

হঠাৎ এক ভাঙন এলো,

আর শব্দ হয়ে উঠল আমার ঘুম।

ভাঙনের স্রোত বুকে এনে দিল গতি,

নিশ্চলতার ভার ধুয়ে নিল জল।

অচেনা ব্যথা জন্ম দিল ভাষা,

চাপা থাকা অনুভব পেল দিশা।

নিজের গভীরতা নিজেই চিনল,

প্রবাহে মিলেই পেল পরিচয়।

এখন আর স্থির থাকা আমার ধর্ম নয়,

চলার মধ্যেই আমার স্বস্তি।

পাথরের স্মৃতি বহন করি বটে,

কিন্তু জলের গানেই আমার অস্তিত্ব।

যেখানে পতন ছিল ভয়,

সেখানেই আজ শুরু।

সুখ দ্যুতিময় কোহিনুর হীরা -- অরুণ কুমার মহাপাত্র

সুখ দ্যুতিময় কোহিনুর হীরা
অরুণ কুমার মহাপাত্র 
০৫/০২/২০২৬
কে না জানে , সুখ সে তো দ্যুতিময়
 কোহিনুর হীরা 
অলীক সে ভাবনায় মগ্ন হয়ে বৃথা
কেন খুঁজিস তোরা
ময়ুর পালকে রৌদ্র কেমন দেখ 
পেতেছে উঠান
ঝর্ণার বুকে কান পেতে শোন 
জন্মান্তরের গান
আলো-ছায়ায় শুয়ে আছে অনাগত
 সভ্যতার ভ্রুণ
চকমকি পাথর ঘসে ভাঙাবো ঘুম 
জ্বালিয়ে আগুন 
সন্তর্পণে মায়ার ফাঁদ এসো সবে 
এড়িয়ে চলি
চল না , পাখি , নদী ,জোছনা আর 
বৃষ্টির কথা বলি
শত ক্রোশ পথ ভেঙে পাই যেন 
প্রকৃত জ্ঞান 
সংসার শৃঙ্খল ছিঁড়ে গাই সত্য সুন্দর 
জীবনের গান ।


Tuesday, February 3, 2026

ডেকেও সাড়া মেলে নি -- দিলীপ ঘোষ

ডেকেও সাড়া মেলে নি
দিলীপ ঘোষ
০২/০২/২৬
ডেকেছিলাম আকর্ষণের হাত নেড়ে
ডেকেছিলাম সুপ্ত স্বপ্নের হুইসেলে
কোলাহলের ধুলোতে মিশে গেছে সব শব্দ
মালগাড়ির গতিতে চলা কবিতা 
জনমানবহীন স্টেশনে হয়েছে জব্দ। 

বাতাসের ঠোঁটে চুম খেয়ে
ডাকের ধ্বনি ফেরে ডান বাম কানে
তারহীন ইথারের প্রাণ প্রিয় ধ্বনি
শুকিয়ে শুকিয়ে প্রাণ হারায় প্রাণে। 

ডেকে ডেকে হৃদয় ক্লান্ত হলে কি হবে
ডাক ধ্বনিত হয় তবু অন্তরে। 
পিপাসার ঠোঁটে জিব হাত বুলিয়ে
নারা বেঁধে রাখে আকাঙ্ক্ষার পিঞ্জরে।

Monday, February 2, 2026

খোলা ক্যানভাসে -- শিপ্রা বসাক

খোলা ক্যানভাসে 
শিপ্রা বসাক 
০১/০২/২০২৬
একটা কদমতলা ছিল, শ্যামের বাঁশি বেজেছিল , শ্যামও ছিল পাশে , 
হৃদয়ে প্রেম ছিল , গানে সুর ছিল , মনও ভরা ছিল সুবাসে।

কাছেই নদী ছিল , নদী ভরা জল ছিল , নৌকা দুলেছিল জলে ,
কাছে আসা ছিল , ভালোবাসা ছিল , কখন মন ছুঁয়ে গেলে ছলে ।

সামনে খোলা ক্যানভাসে , মায়াবী আকাশ ভাসে , বাতাসে বসন্ত ছিল মিশে ,
কত যে রঙীন ছবি , সযত্নে এঁকেছি সবি , কত প্রাণ হেসেছিল, হারিয়েছিল দিশে ।

প্রকৃতির বর্ণে গন্ধে , হৃদয়ের খুশিতে আনন্দে , কেটে ছিল সারা দিনমান ,
আপনার জন ছিল , ভালো বাসাবাসি ছিল , ভালো নাচানাচি ছিল  আর ছিল গান।

বসন্তের হাওয়া মেখে , মলিনতা দূরে রেখে , শুধুই আনন্দ ছিল অনাবিল এক ,
হৃদয়ের আঙিনায় , জয়গান গেয়ে যাই , পৃথিবীর সব প্রেম পূর্ণতা পাক।

Saturday, January 17, 2026

স্বার্থপরের দুনিয়াটায় -- শিপ্রা বসাক

স্বার্থপরের দুনিয়াটায়
শিপ্রা বসাক 
১৭/০১/২০২৬


প্রতিযোগিতায় হার মেনেছি 
শিরোপা তাই ধুলার 'পর 
আপন আপন যতই কর 
আপন কখনো হয়না পর ।

সবে তুমি নতুন এখন 
এত কিসের তোমার জয় 
যতই তুমি খেটে মরো 
রাহুকেতু তোমার নয় ।

ইগোর লড়াই লড়তে হবে
 না পারো তো বিদায় হও ,
আর এক পন্থা তৈল মর্দন 
পারলে জেনো জয় নিশ্চয় ।

সামনে তোমার আপন কত 
পেছনে তারাই ছুরি বয় ,
 মিষ্টি কথায় কুটুস করে 
আঘাত করে শরীরময় ।

ভেজাল তেলে ভেজাল মানুষ ,
ভেজাল ভালোবাসার ভান ,
ভুলের মাশুল গুনতে হবে 
দিতেই হবে প্রতিদান ।

স্বার্থপরের দুনিয়াটায় 
এত কেন হিংসা রাগ !
সহজ ভাবে বাঁচতে গেলেও 
কালনেমির লঙ্কা ভাগ ।

পদ্যলেখায় সাধ্য কত 
থাক না তবে উদ্দেশ্যের ঝাজ 
জোড় হাতে তার বন্দনা গাও
আরতি দাও সকাল সাজ।