Showing posts with label গল্প. Show all posts
Showing posts with label গল্প. Show all posts

Thursday, February 26, 2026

কাঠের ঘোড়া -- সমরেন্দ্রনাথ ঘোষ



                    কাঠের ঘোড়া
                  সমরেন্দ্রনাথ ঘোষ
                        26/02/26
          রহমত মিঞা ও বিশু ঠাকুর দুজনেই এই গলিটার পুরনো বাসিন্দা।বিশু ঠাকুর একজন নামজাদা কাঠমিস্ত্রি।রহমত মিঞার ছোট্ট ব্যাবসা আছে।বছরের পর বছর তাদের বন্ধুত্বটা ছিল এই ঘিঞ্জি গলির আস্থার প্রতীক।

          নির্বাচন এসেছে।চারদিকে থমথমে ভাব।সিংহাসন দখলের লড়াইয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ময়দানে নেমে পড়েছে।

          হঠাৎ বিকেলের দিকে খবর ছড়িয়ে পড়ল-শহরের ওপারে কার যেন র*ক্ত ঝরেছে।ব্যাস!আগুনের স্ফূলিঙ্গ ছড়াতে দেরি হল না।

          মুহুর্তের মধ্যে বদলে গেল চারপাশ।যে হাতগুলো সকালে একসাথে চা খেয়েছিল,বিকেলে সেই হাতগুলোতে অস্ত্র উঠল।বিশু ঠাকুর তাঁর ছেলে বিট্টুকে নিয়ে ঘরে বসে কাঁপছিলেন।বাইরে স্লোগান আর ভাঙচুরের শব্দ।রহমত মিঞার ঘরটাও কাছে।কিন্তু মনে হল এক দূর্ভেদ্য দেওয়াল উঠে দাঁড়িয়েছে।

          হঠাৎ চিৎকার শুনলেন বিশু ঠাকুর-"আগুন!আগুন!আগুন!"

          বিশু ঠাকুরের গুদামে একদল বোমা ছুঁড়েছে।জ্বলছে তাঁর সারা জীবনের সঞ্চয়।

          কোনোরকমে পাঁজাকোলা ক'রে বিট্টুকে বের করে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন অসহায় পিতা।কিন্তু বাইরে উন্মত্ত জনতা।চেনা মুখগুলো অচেনা মুখোশে ঢাকা।

          গলি দিয়ে বেরুতে গিয়ে হোঁচট খেলেন বিশু ঠাকুর।একদল সশস্ত্র মানুষ চড়াও হল।তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন-"আমি বিশু!আমি তোমাদের পরিচিত!"কিন্তু ঘৃণার কোলাহলে মিনতি তলিয়ে গেল।

          অন্ধকারে এক কিশোরের রড এসে পড়ল বিশুর মাথায়।বিট্টু তার বাবার নিথর দেহের উপর আছড়ে পড়ে কাঁদছে।কিন্তু দাঙ্গার কোনো ধর্ম নেই,মায়া নেই।এক পৈশাচিক উল্লাসে বিট্টুর ছোট্ট বুকটা বিদীর্ণ হয়ে গেল মরচে ধরা এক তলোয়ারে।

          পরদিন পুলিশ এলো।গলিটায় শ্মশানের নীরবতা।বাতাসে পোড়া গন্ধ আর র*ক্তের ভ্যাপসা ঘ্রাণ।

          রহমত ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।চোখে জল নেই।আছে শূন্য দৃষ্টি।দেখলেন -রাস্তায় পড়ে আছে বিশু আর ছেলের নিথর দেহ।বিশুর হাতে তখনও শক্ত ক'রে ধরা একটা কাঠের খেলনা ঘোড়া।আগের রাতে বিট্টুর জন্য বানিয়েছিলেন।

          রহমত অস্ফূট স্বরে বললেন-"তোর রক্ত আর আমার রক্ত তো আলাদা ছিলনা বিশু...।"

          পরদিন খবরে শিরোনাম হল-"রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিহতের সংখ্যা দুই।"কিন্তু কাগজে লিখলো না-বিশুর সেই কাঠের ঘোড়াটার কথা যেটার গায়ের র*ক্ত শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
                            

Saturday, September 27, 2025

ইলিশ উৎসবে ছোট মামা -- আশীষ কুমার রায়

 ইলিশ উৎসবে ছোট মামা
আশীষ কুমার রায়
২৭/০৯/২০২৫
ভানগড়ের  অভিজ্ঞতা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ছোট মামা তার নতুন  ট্রিপের প্ল্যান নিয়ে  হাজির, আমরা পাঁচজন মানে আমি ,বাবলু,মৌ,তুলি আর বাবাই তখন আমাদের চিলেকোঠার ঘরে আড্ডা দিচ্ছি,আমার নামতো আপনারা জানেন আমি হলাম বাবুন।
ছোট মামা ঘরে ঢুকেই একটা চেয়ার টেনে বসেই বলে বাবুন তুই তুলি আর মৌ কে নিয়ে নীচে যা, আমি  আমি বাড়ির সবার জন্যে কলেজ স্ট্রিটের তেলেভাজা শপ আরে যেটা বুড়োদার চপ শিল্প নামে বিখ্যাত,সেখান থেকে চপ নিয়ে এসেছি, তোরা নীচে যা আর  আমাদের জন্যে নিয়ে আয় আর আমি তোর মাকে কড়া করে আমার জন্যে চা বানাতে বলেছি সেটাও আসার সময় নিয়ে আসবি, তোরা তাড়াতাড়ি আসবি,আমার একটা ট্রিপের প্ল্যান আছে,তোরা আসলেই সেটা নিয়ে আলোচনায় বসবো, আমরা নীচের তলায় চলে গেলাম,যাওয়ার পথে তুলি আমায় বলে আচ্ছা বাবুনদা ছোট মামার এবারের প্ল্যান সম্পর্কে কিছু আন্দাজ করতে পারছিস,আমি বললাম আরে আমি তো কোন ছার তোরা জানিসনা যে ছোট মামার মাথায় কখন কোন প্ল্যান আসে তা ভগবানের পক্ষেও বোঝা অসাধ্য, শুনে ওরা হেসে দিলো।আমরা চপ , মুড়ি আর চা নিয়ে আসলাম,আমাদের খাওয়ার পরে ছোট মামাও তার চা খাওয়া শেষ করে চায়ের কাপটা টেবিলের উপর রাখলো।
এবার ছোট মামা তার প্ল্যান নিয়ে আলোচনা শুরু করলো,ছোট মামা বলে দেখ আমরা এবার যেখানে যাবো সেখানে আমাদের দু তিন দিনের মধ্যেই যেতে হবে না হলে আসল মজাই মিস করবো, বাবলু বলে আচ্ছা ছোট মামা আমরা এমন কোথায় যাবো যে এত তাড়াহুড়ো করে যেতে হবে, ছোট মামা বলে আমরা এবার সুন্দরবন যাবো, শুনে বাবাই বলে আচ্ছা ছোট মামা আমরা যখন সুন্দরবন যাবো তার জন্যে এত তাড়াহুড়ো কিসের,ছোট মামা বলে তোরা বেকার পড়াশোনা করছিস,দুনিয়ার কোন খবর রাখিস না, তোরা জানিসনা যে এই সময় সুন্দরবনে ইলিশ মেলা বা উৎসব হয়। সুন্দরবনের ইলিশ মেলা বা সুন্দরবন ইলিশ উৎসব হলো একটা বার্ষিক উৎসব যা এই সময়েই হয়,যখন সুন্দরবনের নদীতে ইলিশ মাছ পাওয়া যায়,এই মেলায় ইলিশ পোলাও,ইলিশ ভাপা,সর্ষে ইলিশ,ইলিশ ভাজা, ইলিশ মাছের পাতুরি এবং ইলিশ বিরিয়ানি পাওয়া যায়,এছাড়াও চিংড়ি ও কাঁকড়ার নানান পদও পাওয়া যায়।এই উৎসবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং লোকসংগীতের আয়োজন করা হয় আর সেই সঙ্গে থাকে স্থানীয় হস্তশিল্পের মেলা,তুলি বলে এইবার বুঝলাম তুমি কেনো দু একদিনের মধ্যেই যেতে বলছো।
শোন আমরা যাবো সুন্দর বনের সজনেখালি, ওখানে নৌকাতেই ইলিশ মাছের বিভিন্ন ধরনের পদ পরিবেশন করা হয়,আমরা ওখানে নৌকাতেই ইলিশ মেলা পালন করবো,আমরা সবাই বললাম উফ এটাতো তোমার জব্বর আইডিয়া,ছোট মামা বলে আমার সব প্ল্যানই জব্বর হয়,আর শোন সুন্দরবনের সজনেখালি যাওয়ার পিছনে আমার আরও একটা কারণ আছে মানে আমরা এক ঢিলে দুই পাখি মারবো,বাবাই বলে সেটা কিরকম ছোট মামা,ছোট মামা বলে সজনেখালির টাইগার রিজার্ভের মানে মোদ্দা কথায় সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের মধ্যে নৌকায় করে বাঘ দেখা যায়,কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট স্থান বলা কঠিন,কারণ এটা আসলে বনের সরু জলপথ এবং খাঁড়ির মধ্যে,বাঘ দেখার সম্ভাবনা বাড়ে যখন জোয়ারের সময় বা ভোরের দিকে নদী ও খাঁড়িগুলোতে বাঘেরা বেশি আনাগোনা করে,আরে প্রয়োজন হলে আমরা আমাদের নৌকা তীরে দাঁড় করিয়ে না হয় পায়ে হেঁটেই বাঘের খোঁজ করবো,ছোট মামার এই দ্বিতীয় পরিকল্পনা শুনে আমরা ইলিশ মেলায় যাওয়ার কথা শুনে যতটা আনন্দিত হয়েছিলাম তার চেয়ে দশগুণ বেশি ভয় পেলাম।মৌ বলে আচ্ছা ছোট মামা নৌকাতেই বসে আমরা অপেক্ষা করবো,কপালে থাকলে ঠিক বাঘের দেখা পাবো,আবার জঙ্গলে গিয়ে লাভ কি,আমি শুনেছি বাঘ জঙ্গলের গভীরে শিকার খোঁজে আর মানুষের উপর আক্রমণও করতে পারে,বিশেষ করে যদি ওরা মানুষকে জঙ্গলের ভেতরে দেখে।ছোট মামা হেসে বলে তোরা আমার ভাগ্নে,ভাগ্নি হয়ে এত কাপুরুষ হবি আমি ভাবতেই পারছি না,তোরা একটা কথা কেনো ভুলে যাচ্ছিস তোদের সাথে আমি তো থাকবো,আর তোরা জানিসনা হয়তো একসময় শিকার আমার শখ ছিলো,আমি বললাম হ্যাঁ মা আমাদের সেকথা বলেছে তবে আমি যতদূর জানি তোমার শখ ছিলো কিন্তু কোনদিন শিকার করোনি,ছোট মামা বলে ডেপোমি করিস না,জানবি শিকারের প্রতি প্রবল শখ থাকা মানেই অর্ধেক শিকার করা,আমরা আর কোনও কথা না বলে পরস্পরের দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকালাম। 
ছোট মামা বলে শোন আমি পরশু সকাল সাড়ে পাঁচটার মধ্যে গাড়ি নিয়ে চলে আসবো তোরা রেডি হয়ে থাকবি, আমরা কোলকাতা থেকে সজনেখালি  যাওয়ার জন্য গাড়ি নিয়ে গোদখালি ফেরি ঘাট পর্যন্ত যাবো, গাড়ি নিয়ে যেতে হবে ১৩০ কিলোমিটারের মতন।আমরা ই,এম বাইপাস, বানতলা, ঘটক পুকুর,বাসন্তী হয়ে গদখালী যাবো।গদখালী থেকে আমরা ফেরি বোটে করে সজনেখালি যাবো,কারণ এটা জলপথ, গদখালীতে আমরা গাড়ি পার্ক করবো।
ছোট মামা বলে তাহলে ওই কথাই রইলো আমি পরশু ভোরে চলে আসছি,শোন আমি তো দূরবীন নেবো,তোরাও তোদের যার যার কাছে দূরবীন আছে নিয়ে নিবি, আমি বলি আমাদের সবার কাছেই আছে,ছোট মামা বলে তাহলে তো কোন সমস্যাই নেই, আসলে আমাদের দূরবীন দিয়ে বাঘের গতিবিধির উপর নজর রাখতে হবে,এবার ছোট মামা বলে আমি নীচে গিয়ে সবাইকে আমাদের যাওয়ার ব্যাপারে বলে দিচ্ছি,তোদের আর ওদেরকে বেশি কিছু বলতে হবে না,এই কথা বলেই গটগট করে ছোট মামা নীচে চলে গেলো,বাবলু বলে আচ্ছা বলতো ছোট মামা অত তাড়াহুড়ো করে কেনো আমাদের না নিয়েই সবাইকে বলতে গেলো, মৌ বলে কেনোরে বাবলুদা,,বাবলু বলে ছোট মামা সবাইকে গিয়ে বলবে ইলিশ মেলায় আমরা যাবো,ছোট মামার যে এর সাথে ব্যাঘ্র দর্শনের অভিপ্রায় আছে সেটা বলবে না, আমাদের সঙ্গে নিয়ে বলতে গেলে যদি আমাদের মধ্যে থেকে কারোর মুখ থেকে কোন বেফাঁস কথা বেড়িয়ে যায়,তুলি বলে একদম ঠিক বলেছিস আর সেই জন্যেই দেখলিনা ছোট মামা যাবার আগে বলে গেলো আমাদের বেশি কিছু না বলতে। 
যাওয়ার দিন ছোট মামা নিজের বলা টাইমের আগেই এসে হাজির,যদিও আমরাও সবাই রেডি হয়ে বসেই ছিলাম,ছোট মামা আসার পরে আমরা আমাদের লাগেজ নিয়ে গাড়িতে রাখতে যেতেই দেখি ছোট মামা তার সাথে একটা রাইফেল নিয়েছে,আমি বললাম ছোট মামা তুমি এটা কি করেছো, তুমি তো জানো সুন্দরবনে ব্যক্তিগতভাবে রাইফেল নিয়ে ঘোরার অনুমতি নেই , সুন্দরবন একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি রক্ষার জন্য কঠোর নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়,সুন্দরবনে অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ। শুধুমাত্র বন্যপ্রাণী রক্ষার জন্য প্রশিক্ষিত বনকর্মীরা অনুমোদিত অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন।ছোট মামা বলে আরে আমি সব জানি,আমি এটা নিয়েছি শুধুমাত্র তোদের প্রোটেকশনের জন্য।বাবলু বলে তুমি ওটা নিয়ে ঢোকার আগেই তো বাজেয়াপ্ত করে নেবে,ছোট মামা অনেকক্ষণ ধরে কি ভাবলো তারপর বলে এটা নিয়ে এখন কি করা যায় বলতো,বাবাই বলে তুমি ওটা আমাদের বাড়িতে রেখে দাও,ছোট মামা আমায় বলে বাবুন তাই কর এটাকে বাড়িতে রেখে আয়, রাইফেল রেখে এসে আমি গাড়িতে বসার পর ছোট মামা গাড়ি স্টার্ট করলো তখন সকাল ছটা বাজে,আমরা যাওয়ার পথে রাস্তায় এক জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নিলাম,আমরা সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ সজনেখালি পৌছলাম।
ছোট মামা কোলকাতা থেকেই একটা ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে ট্যুর প্যাকেজের নৌকাতে আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যাবস্থা করে নিয়েছিল।আমরা ওই নৌকাতেই ইলিশ উৎসব পালন করলাম,ছোট মামা লাঞ্চ আর ডিনারে ইলিশ মাছের মোটামুটি সব আইটেম ভরপুর খেলো,আমরা ছোট মামাকে আগে কোনদিন এত খেতে দেখিনি,রাতভর আমরা বাঘ দেখার আশায় নৌকায় বসে থাকলাম,ছোট মামা রাতে অনেক বার নৌকার শৌচাগারে গেলো আর রাতের অনেকটা সময় সময় শৌচাগারেই সময় কাটালো,বাবাই ছোট মামার বারবার শৌচাগারে যাওয়া দেখে হাসতে হাসতে বললো এটা ইলিশ উৎসবের সাইড এফেক্ট, আমরা হাসতে হাসতে বলি তা যা বলেছিস, যদিও আমরা সারারাত বাঘ দেখার জন্যে উৎসুক হয়ে বসে থাকলাম কিন্তু বাঘ তো দূরের কথা কোনরকম বন্যপ্রাণী দেখতে পেলাম না,সকালে যখন আমরা সজনেখালি ফিরলাম তখন ছোট মামা বলে এখানে একটা গেষ্ট হাউসে আমাদের থাকার বন্দোবস্ত করে রেখেছি,আমরা আজ এখানেই থাকবো কাল সকালে ব্রেকফাস্ট করে কোলকাতার জন্য রওনা দেবো,আর শোন এখানে আমার বলা আছে যে আমাদের জন্য ইলিশ মাছের বিভিন্ন আইটেমের সঙ্গে চিংড়ি মাছের আর কাঁকড়ার আইটেম রাখতে,শুনে তুলি বলে ছোট মামা তুমি আজকেও এসব খাবে,কালকে অর্ধেক রাত তো শৌচাগারে কাটালে,ছোট মামা বলে আরে আমি কি বারবার ওখানে এমনি যাচ্ছিলাম,তবে তোরা শোন আমি ওখান থেকেই তো বাঘের দর্শন পেয়েছি তাও একটা নয় দু দুটো বাঘ দেখেছি,আসলে এতক্ষণ তোদের এই কথা বলিনি পাছে তোরা কষ্ট পাস এই ভেবে যে ছোট মামা বাঘের দেখা পেলো আর আমরা পেলাম না,তুলি আমার কানের সামনে মুখ নিয়ে,আস্তে করে বললো আসলে বাবুনদা মনে হয় পেট গরম থেকেই বাঘ দেখেছে। 
ছোট মামা গেষ্ট হাউসে ছোট মামার জন্যে একটা ঘর,আমার,বাবলুর আর বাবাই এর জন্য একটা ঘর এবং তুলি,মৌ এর জন্যে একটা ঘরের ব্যাবস্থা করে রেখেছিল,ছোট মামা সব ট্যুরেই চায় আমরা ছেলেরা তার সাথে এক ঘরে থাকি কিন্তু আমরা ছোট মামার ঘুমের মধ্যে নাসিকা গর্জনের ভয়ে নানান অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে যাই,ছোট মামা তাই এখন আমাদের জন্য আলাদা ঘরের ব্যাবস্থা করে। 
ছোট মামা গেষ্ট হাউসে ব্রেকফাস্টে ও বেশ কয়েকটা ইলিশ মাছ ভাজা চোখের নিমেষে খেয়ে নিলো,ব্রেকফাস্ট শেষ করে আমরা আমরা ছোট মামাকে জিজ্ঞাসা করলাম আমরা আজ সারাদিন কি করবো গেষ্ট হাউসেই বসে থাটবো,ছোট মামা বলে তোদের কি মনে হয় তোদের ছোট মামা বেড়াতে এসে বসে থাকার লোক,শোন আমি এখানের ম্যানেজার কে দিয়ে একটা নৌকা ভাড়া করেছি,আমরা মাতলা নদী ধরে ওই নৌকায় ম্যানগ্রোভ বন আর একেবারে শান্ত প্রকৃতির কাছাকাছি যাবো।আমরা বললাম দারুণ আইডিয়া ছোট মামা।আমরা ছোট মামার এই আইডিয়া শুনে আমরা সবাই খুবই উৎফুল্ল হয়েছিলাম কিন্তু তখন আমরা ঘুণাক্ষরেও বুঝতেই পারিনি যে এই নৌকাবিহারে গিয়ে যে আমাদের এতটা নাজেহাল হতে হবে। 
আমরা যখন নৌকাবিহারে যাবার জন্য গেষ্ট হাউস থেকে বেড়োচ্ছি তখন ছোট মামা বলে দু মিনিট দাঁড়িয়ে যা তোরা,ছোট মামা ম্যানজার এর দিকে তাকাতেই ম্যানেজার বলে সব রেডি হয়ে গেছে স্যার এই দিলো বলে,আমরা অবাক হয়ে সবাই সবার দিকে তাকালাম,বাবলু বলে আরে ছোট মামা আবার কি নেবে,এই সময় একটা ছেলে এসে একটা বিশাল সাইজের প্যাকেট দিলো ছোট মামার হাতে,ছোট মামা বললো সবকিছু ঠিকঠাক দিয়েছো তো,ছেলেটা বলে হ্যাঁ স্যার আপনি যা যা বলেছিলেন সব আছে এটাতে, ছোট মামা বাবলুর হাতে প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বলে চল এবার যাওয়া যাক।
গেষ্ট হাউস থেকে বেড়োনোর পর মৌ ছোট মামাকে জিজ্ঞাসা করে এই প্যাকেটে কি নিলে,ছোট মামা বলে আরে তেমন কিছুই নেইনি,শুধুমাত্র ইলিশ দোপেয়াজা,ইলিশ মাছ কড়া করে ভাজা,চিংড়ি ভাপা,চিংড়ি ভুনা, চিংড়ি ভাজি,কাঁকড়ার ঘিলুর ভর্তা,কাঁকড়ার ঝাল আর সবার জন্যে পাঁচটা করে নরম তুলতুলে রুমালি রুটি,ছোট মামার এই “শুধুমাত্র আইটেম”শুনে আমাদের সবার “আত্মারাম খাঁচাছাড়া"।বাবাই আমাকে বলে আমি নিশ্চিত ছোট মামা আবার কোন অঘটন ঘটাবে,আমি বললাম আমারও সেটাই মনে হচ্ছে কিন্তু কি করবি বল একমাত্র বড় মামা এখানে থাকলে ছোট মামাকে থামাতে পারতো,আমাদের কারোর কথায় তো পাত্তাই দেবে না।
আমরা মাতলা নদীতে নৌকায় করে ঘুড়ে বেড়াচ্ছি,বেশ মজা লাগছে সবার,এমন সময় তুলি আমাকে কনুইয়ের খোঁচা দিয়ে দেখায় ছোট মামা প্যাকেট খুলে খাবার খেতে শুরু করেছে,আমাদের দিকে তাকিয়ে বলে আরে তোরা দাঁড়িয়ে আছিস কেনো,খেতে খেতে প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ কর,বাবাই বলে কি বলছো এখন খাবো, এইমাত্র তো ব্রেকফাস্ট করলাম,শুনে ছোট মামা বলে তোদের প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের এটাই সমস্যা তোরা খেতে শিখলিনা আর খেয়ে হজমও করতে পারিসনা আর আমাকে দেখ লোহা খেয়েও হজম করতে পারি,আমরা আর কোন কথা না বলে আবার প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ করতে লাগলাম। 
বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ দেখি ছোট মামা নৌকার চালকের সাথে গিয়ে কথা বলছে,মনে হল ছোট মামা বেশ কাকুতি মিনতি করছে, তখন আমরা ম্যানগ্রোভ বনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি,আমি আর বাবলু এগিয়ে গিয়ে বলি,কি হয়েছে ছোট মামা,শুনে ছোট মামা বলে আমাকে এই মূহুর্তে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হবে,সেটাই এই মাঝি ভাইকে বলছিলাম,আমরা বলি চলো গেষ্ট হাউসে ফিরি,ছোট মামা পেটে হাত রেখে বলে আরে আমার হাতে অত সময় নেই,ফিরতে ফিরতে হয়তো নৌকাতেই অঘটন ঘটে যাবে,শুনে মাঝি ভাই বলেন আমি বনের পাশে নৌকা দাঁড় করতেছি,আপনি নেইমে জায়গা বুইঝে কইরে আসবেন,ছোট মামা বলে তাই করো, নৌকা বনের পাশে দাঁড়াতে ছোট মামা দৌড় লাগানো ভালো জায়গার সন্ধানে,ছোট মামার পিছনে বাবলু, বাবাই আর আমি নৌকা থেকে নেমে দাঁড়াই,একটু পরে শুনি ছোট মামা বা,বা করে গোঙাচ্ছে,আমরা ছুটে যাই,গিয়ে দেখি ছোট মামা ওখানে শুয়ে শুয়ে সেই বা,বা করে গোঙাচ্ছে,আমরা দেখলাম আমরা যেতেই একটু দূর থেকে একটা বাচ্চা শিয়াল ছুটে পালালো,আমরা ছোট মামার চোখে মুখে জল দিয়ে উঠিয়ে বসাই,ছোট মামাকে বলি কি হয়েছিল,তুমি ওমন বা, বা করছিলে কেনো,ছোট মামা বলে আরে একটা মস্ত বড় রয়েল বেঙ্গল টাইগার প্রায় আমার ঘাড়ের সামনে এসে পড়েছিল,আমি বলি আরে ওটা তো একটা বাচ্চা শিয়াল ছিলো, ছোট মামা রেগে বলে এখন তোদের কাছে শিখতে হবে কোনটা বাঘ আর কোনটা শিয়াল,ওসব ছাড় চল নৌকায় যাই,আমি তোদের কোন বিপদে ফেলতে পারবোনা আর তাছাড়া আমার কাছে তো আমার রাইফেলটাও নেই, থাকলে এক গুলিতেই বাঘটাকে ঢিট করে দিতাম, আমরা নৌকায় ফিরে আসি,সব শুনে তুলি আর মৌ বলে আর ঘুরতে হবে না ছোট মামা চলো আমরা এবার গেষ্ট হাউসে ফিরি, সেইমতো আমরা গেষ্ট হাউসে ফিরলাম,ছোট মামা নিজের ঘরে যাওয়ার পর আমরা সবাই গিয়ে তুলিদের রুমে গিয়ে বসি,আমরা ছোট মামার আজকের কীর্তিকলাপ নিয়ে মজা করছি এমন সময় হোটেলের একটা ছেলে এসে বলে আপনাদের মামা বাবু আপনাদের খাবার টেবিলে খাওয়ার জন্যে ডাকছেন,তুলি আর মৌ আঁতকে উঠে বলে ছোট মামা আবার খাবে, আমি বললাম তোরা মিলিয়ে নিস আজকে আমাদের কপালে শনি ঠাকুর নাচছে। 
আমরা খাবার টেবিলে গিয়ে আমাদের মতন করে খেলাম আর ছোট মামা তার স্বভাবসিদ্ধ অনুসারে মনের মতন করে খেলো,খাবার পর বলে চল এবার যার যার ঘরে গিয়ে বিশ্রাম কর আর পাড়লে ঘুমিয়েনে,দেখবি ঘুমিয়ে নিলে এখনের খাবার সব হজম হয়ে যাবে,রাতের জন্যেও ভালো ভালো আইটেম বলে রেখেছি। 
আমরা কেউই ঘুমালাম না বরং এক রুমে বসে সবাই আড্ডা দিলাম,দেখতে দেখতে কখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে আমরা কেউ বুঝতেই পারিনি,মৌ বলে সেই থেকে ছোট মামার কোন আওয়াজ পাচ্ছিনা,বাবাই বলে নির্ঘাত ঘুমিয়ে খাবার হজম করছে,তুলি বলে ছোট মামা আসা থেকে যা খাবার খেয়েছে তা হজম করতে তিনদিনের টানা ঘুম দরকার, আমি হেসে বলি তোরা বোস,আমি গিয়ে একবার দেখে আসি,আমি ছোট মামার ঘরে গিয়ে দেখি দরজা খোলাই আছে আর ছোট মামা খাটে শুয়ে ঘুমাচ্ছে,আমি ছোট মামাকে ডাকতে যাবো তখন হঠাৎ করে একটা দুর্গন্ধ আমার
নাকে আসে,আমি ভালো করে তাকিয়ে দেখি ছোট মামা ঘুমাচ্ছে না বরং ছোট মামা মলত্যাগ করে কাপড়ে চোপড়ে এক করে বেহুশ হয়ে পড়ে আছে। 
আমি রুমে গিয়ে ওদের সবটা বলি,শুনে সবাই আমার সাথে ছোট মামার রুমে ছুটে আসে,বাবলু বলে তোরা এই দিকটা একটু দেখ আমি গিয়ে ম্যানেজার কে বলে একজন ডাক্তারের ব্যাবস্থা করছি,আমি বললাম তাই কর। 
কিছুক্ষণ পরে একজন বয়স্ক ডাক্তার বাবু আসলেন,উনি ছোট মামাকে ভালো করে পরীক্ষা করে আমাদের বললেন খাবারের গন্ডগোলের জন্যে ওনার ডিহাইড্রেশন হয়েছে, উনি ছোট মামাকে একটা ইনজেকশন দিলেন, আমাদের বললেন প্রশান্ত মানে এই গেষ্ট হাউসের ম্যানেজারের সাথে কথা বলে এনাকে ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাও আমি রেফার করে দিচ্ছি,বাবাই ডাক্তার বাবুর ফিস মিটিয়ে ওনাকে এগিয়ে দিয়ে আসতে গেলো,ডাক্তার বাবু যাওয়ার সময় প্রশান্ত বাবুকে সবটা বলে গেলেন,প্রশান্ত বাবু সব শুনে ফোন করে একটা ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স আনালেন এবং ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে ফোন করে গদখালীতে একটা অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর ব্যাবস্থা করলেন,ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সে ছোট মামাকে  গদখালী ঘাট পর্যন্ত নিয়ে আসলাম আবার গদখালী থেকে ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম,পৌছানোর পরেই হাসপাতালের একজন ডাক্তার বাবু ছোট মামাকে পরীক্ষা করে সঙ্গে সঙ্গে ছোট মামাকে ভর্তি করে নিলো। 
আসার পথে আমরা ফোন করে বাড়িতে সবটা জানালাম,আমরা বড় মামাকেও সব জানালাম। 
খবর পেয়েই বড় মামা আর মেজো জেঠু চলে এলো একজন অতিরিক্ত ড্রাইভার মানে ভজনদাকে নিয়ে,পরদিন সকালে আমরা ভজনদাকে নিয়ে গদখালী যাই সেখান থেকে আমাদের গেষ্ট হাউসে,বড় মামা ফোন করে গেষ্ট হাউসের টাকার হিসেব জেনে নিয়ে অনলাইনে পেমেন্ট করে দিয়েছে,আমরা আমাদের লাগেজ আর ছোট মামার লাগেজ নিয়ে গদখালী এসে সেখান থেকে ছোট মামার গাড়ি পার্কিং থেকে নিয়ে ওই গাড়িতে করে আবার হাসপাতালে এলাম,বিকেলে ছোট মামাকে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করার পর আমরা বাড়ি ফেরার জন্য হাসপাতাল থেকে বাইরে আসার পর বড় মামা ছোট মামাকে বলে তপু ক্যানিং বাজারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে টাটকা দেখে কয়েকটা ইলিশ মাছ নিয়ে নেবো নাকি,তোর বৌদিরা রসিয়ে কষিয়ে রান্না করে দেবে তোর জন্যে,বড় মামা মেজো জেঠুকে বলে জানো প্রলয় এই ওর বৌদিদের আশকারা আর আদরে এই তপুটা দিনকে দিন বেয়াকেল্ল হয়ে যাচ্ছে আর সঙ্গে আছে এই বিচ্ছুর দল,ছোট মামা যা বলে তাতেই নাচে,আমরা অপরাধীদের মতো মুখ করে বসে থাকলাম,বড় মামা বলে এবার কোলকাতায় যাওয়ার পর তোর এই কথায় কথায় ট্যুর করা আর বাচ্চাগুলোকে বিপদে ফেলা বার করছি,তোর ট্যুর করাই বন্ধ করে দেবো,ছোট মামা চুপচাপ করুন মুখ করে বসে থাকে,আমরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে বলা বলি করি এই ছোট মামার ট্যুরে যাওয়া বন্ধ যদি ক্ষনস্থায়ী হয় তাহলে ঠিক আছে কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হলে আমরাই সব চেয়ে বেশী কষ্ট পাবো,ছোট মামা ছাড়া আর কে আমাদের বেড়াতে নিয়ে যাবে,মৌ হালকা চালে বলে ওসব নিয়ে কেউ টেনশন করিসনা,জানিস তো ছোট মামাকে আটকে রাখার ক্ষমতা হয়তো ভগবানের হাতেও নেই,আমরা সবাই বললাম তা যা বলেছিস।আমরা রাতে যখন বাড়িতে এসে ঢুকলাম তখন মা,কাকী,জেঠিমাদের কাছে আমরাই হলাম সব নষ্টের গোড়া,আমরা আর কোন কথা না বাড়িয়ে ফ্রেশ হয়ে খাবার খেয়ে শুতে চলে গেলাম।

Tuesday, September 16, 2025

ভানগড়ে প্ল্যানচেট -- আশীষ কুমার রায়

ভানগড়ে প্ল্যানচেট
আশীষ কুমার রায়
১৬/০৯/২০২৫
এখন আমাদের গরমের ছুটি চলছে তাই বাড়ির বড়রা বলাবলি করছিলো যে আমাদের সবাইকে এই রবিবার মামা বাড়ি দিয়ে আসবে। জেঠু বললো ঠিকই পড়াশোনার চাপে ওদের অনেক দিন হলো কোথাও যাওয়া হয়না,যাক ছুটিতে  কদিন না হয় ওখানে কাটিয়ে আসুক। শুনে তো আমরা সবাই আহ্লাদে আটখানা। 
সবে দুপুরের খাওয়ার খেয়ে আমরা কচিকাঁচার দল চিলেকোঠার ঘরে বরাবরের মত জড়ো হলাম। সবার মনে আনন্দ, আমরা প্ল্যান করছি মামা বাড়িতে গিয়ে কি কি করবো। এমন সময় দেখি ধূমকেতুর মতন ছোট মামা এসে  হাজির। 
দেখি ছোট মামার হাতে একটা খাম আর ছোট মামা মুচকি মুচকি হাসছে, ছোট মামা আসায় আমাদের যেমন আনন্দ হলো, তেমনি ছোট মামার মুচকি হাসি দেখে প্রত্যেকের মনে চাঁপা উৎেজনা হলো, উৎেজনা বলাটা ভুল বলা হবে, আসলে সবার মনে দেখা দিলো এক অজানা ভয়। 
ছোট মামাকে তো আমরা হাড়ে হাড়ে চিনি আবার নিশ্চিত ওনার মস্তিকে কোনো পরিকল্পনা এসেছে যেটার জন্যে হয়তো আবার কোনও অঘটন ঘটতে চলেছে। ছোট মামা আমায় বললো যা আগে নীচে গিয়ে আমার জন্য চা, জলখাবারের ব্যাবস্থা কর, তোদের জন্য অপেক্ষা করছে একটা বিশাল চমক। 
আমরা একে অপরের দিকে চাওয়া চাই করলাম, আমি নীচে চলে গেলাম মা, জেঠিমাকে  খবর দিতে। মা ছোট মামার এই ছুটির মধ্যে আসায় বেশ ভীতসন্ত্রস্ত হলো, জেঠিমাকে বললো দেখো বড়দি নির্ঘাত তপুর মাথায় কোন উদ্ভট বুদ্ধি এসেছে। জেঠিমা বললো তুই আগে থেকেই বড় অস্থির হোস, দেখ হয়তো ওদের নিয়ে যেতেই এসেছে,শুনে মা বলে,শোন দিদি তপু তোমার নিজের ভাই হলে কি হবে ওকে আমি তোমার চেয়ে ঢের বেশি চিনি।
তোমরা ভাবছো নিশ্চয়ই তপু আবার কে,তপু আমাদের ছোট মামার নাম, পুরো নাম  তপব্রত লাহিড়ী,বড়রা সবাই ছোট মামাকে তপু বলেই ডাকে। 
কোনমতে ছোট মামার চা জলখাবারের পাট চুকল,আমরা সবাই অধীর আগ্রহে ছোট মামার চমকের অপেক্ষায় আছি। 
ছোট মামা এবার পাশে রাখা খামটা খুললো আর বের করলো সাতটা  কোলকাতা স্টেশন থেকে জয়পুর যাওয়ার আগামী বৃহস্পতিবারের অনন্যা এক্সপ্রেসের টিকিট, বাবলু বলে তবে কি এবার আমরা জয়পুর ঘুড়তে যাবো কিন্তু একটা এক্সট্রা টিকিট দেখছি এটা কার জন্য ছোট মামা,আমরা তো  ছয়জন, মানে তুমি আমি, বাবুন,মৌ,তুলি আর বাবাই। 
একটু মুচকি হেসে ছোট মামা বললো ধৈর্য্য ধর সময় মতন দেখতে পাবি। আমি বললাম জয়পুর দারুন জায়গা,পিঙ্ক সিটি,ওখানে অনেক কিছু দেখার আছে যেমন হাওয়া মহল, নাহারগড় দুর্গ,জল মহল,অমর জওয়ান জ্যোতি আরও কত দর্শনীয় জায়গা। 
ছোট মামা বলে আরে থাম থাম আমরা জয়পুর যাচ্ছি ঠিকই তবে জয়পুরে আমরা থাকবো না, সেখান থেকে আমরা যাবো ভানগড় দুর্গ মানে যেটা দিনের বেলায় মনোরম স্থান আর রাতে ভুতুড়ে বাড়ি, তোরা জানিস রাত নামার পর সাথে সাথে দূর্গের আশেপাশে বসবাসকারী গ্রামবাসীদের
 আর্তনাদ শোনা যায়। ছোট মামার ভুতের কথা শোনার পর আমাদের তো সবার আত্মারাম খাঁচা।
বাড়ির বড়রা সবাই শোনার পর বাগড়া দিলো, সবাই বলে জঙ্গল, পাহাড়, নদী সব জায়গায় কান্ড বাধিয়ে এবার ভুতের সাথে মস্করা করে সবকটা অকালে মরবি। আমরা সবাই বুঝিয়ে সুঝিয়ে অনেক কাকুতিমিনতি করে বড়দের রাজি করলাম।
আমাদের ট্রেন ছিলো কোলকাতা স্টেশন থেকে দুপুর একটা বেজে দশ মিনিটে, আমরা অনেক আগেই পৌঁছে গেছি, প্ল্যাটফর্মে ট্রেন আসার পর আমরা আমাদের কোচে উঠে যে যার সিটে বসলাম। ট্রেন ছাড়ার ঠিক দু মিনিট আগে এক কাপালিক টাইপের লোক আমাদের পাশে এসে বসলেন, ওনার হাতে সুটকেস এর সাথে ছিল একটা অপরিস্কার বড় পুঁটলি। আমরা সবাই হকচকিয়ে উঠলাম, আমি কিছু বলে ওঠার আগেই ভদ্রলোক ছোট মামাকে বললেন, রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম ছিল তাই পৌছতে দেরী হল, ছোট মামা বললো আরে বাবাজি আমি তো ভাবলাম আপনি হয়তো ট্রেনটা মিস করবেন,শুনে ভদ্রলোক একগাল হেসে বললেন যখন ওদের ডাক শুনতে পেয়েছি তখন ট্রেন মিস করি কিভাবে।আমরা অবাক হয়ে গেলাম আমরা তো কেউ ওনাকে ডাকিনি। 
এবার ছোট মামা নড়েচড়ে বসলো,প্রথমেই আমাদের সাথে ওনার পরিচয় করিয়ে দিলো, ছোট মামা বললো শোন উনি হচ্ছেন একজন বিখ্যাত তান্ত্রিক ভোলানাথ আচার্য মহাশয়, উনি বহু বছর কামাক্ষায় বসে শব সাধনা ও শ্মশান সাধনা করেছেন, উনি তন্ত্র সাধনায় মাধ্যমে ভূত বা প্রেতাত্মাদের বশ করা বা তাদের থেকে সুরক্ষা পাওয়ায় পারদর্শী।এরপর ছোট মামা ওনাকে বলে এরা হলো আমার ভাগ্না আর ভাগ্নি,আমাদের প্রত্যেকের সাথে আলাদা আলাদা করে পরিচয় করালো। 
এবার ছোট মামা আমাদের আসল উদ্দেশ্য জানাল, ছোট মামা বললো শোন আমার এক বন্ধুর একটা পুরনো বাড়ি আছে  রাজস্থানের আলওয়ার জেলার রাজগড় পৌরসভায়  ভানগড় গ্রামে,ওর বাড়িটা ওই দূর্গের কাছেই, এখন অবশ্য ওখানে ওদের কেউই থাকে না তবে আমার বন্ধু লোক দিয়ে বাড়িটা পরিস্কার করিয়ে আমাদের ওখানে থাকার বন্দোবস্ত করে রেখেছে।ভানুমতী বলে একটি মেয়ে আমাদের জন্য রান্নাবান্না করবে আর আমাদের দেখাশোনা করবে।শোনা যায় এই ভানুমতী তান্ত্রিক সিংঘিয়ার বংশোদ্ভূত,এই সিংঘিয়া ছিলেন রাজকুমারী রন্তবতীর প্রেমে পাগল তবে রাজকুমারী রন্তবতীই তাকে বোল্ডারে পিষে হত্যা করেন।ওনার অভিশাপ ভানগড়কে গ্রাস করে।এটা হলো পুরো ঘটনা এবার শোনা ওখানে ভোলানাথ আচার্য মহাশয়  প্ল্যানচেট করে সিংঘিয়া আর রাজকুমারী রত্নবতীর আত্মাকে আনবেন আর আমরা ওনাদের কাছেই সমস্ত ইতিহাস জানবো, মনে রাখিস ইতিহাসে আমরা একটা পুরানো সত্যকে তুলে ধরবো। যেটা একটা ঐতিহাসিক বিপ্লব। 
আমরা ছোট মামার সব কথা শুনলাম ও বুঝলাম কিন্তু কেউই ঠিক হজম করতে পারলাম না।আমরা সবাই শুধু কথার শেষে ঘাড় নাড়লাম। 
পরদিন বিকেল পাঁচটায় আমরা জয়পুর পৌছলাম,সেদিন আমরা জয়পুরের শতাব্দী নগরে একটা হোটেলে উঠলাম। শনিবার আমরা সকাল নটার সময় একটা গাড়ি ভাড়া করে ভানগড়ে এগারোটা নাগাদ পৌছলাম।
ওখানে ছোট মামার বন্ধুর বাড়িতে পৌঁছে দেখি ভানুমতী আমাদের জন্য লাল মাস বানিয়ে রেখেছে,আমরা সবাই ফ্রেশ হয়ে খেতে বসলাম,দেখলাম মাঠানিয়া লাল লঙ্কা দিয়ে ভানুমতী দারুন সুস্বাদু লাল মাস মানে মশলাদার মটন কারি বানিয়েছে। ভানুমতী আমাদের বললো রাতে আমাদের বুনো খরগোশ রান্না করে খাওয়াবে।
ছোট মামা বললো আজ আমরা সবাই ক্লান্ত তাই বিশ্রাম করি। কাল আমরা ভানগড় দূর্গে যাবো তারপর আমরা আলওয়ারের আরাবলি পাহাড়ের কোলে ভানগড় দুর্গের চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখবো।সোমবার আমরা ভানগড়ে বেশ কিছু প্রাচীন মন্দির রয়েছে, যা এখানকার আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বোঝায় সেগুলো ঘুড়ে দেখবো।দেখ মঙ্গলবার আমাদের প্রচুর কাজ,সেদিন সকাল থেকে আমাদের প্ল্যানচেটের জন্য যাবতীয় কাজ করতে হবে,সেদিন ভোলানাথ আচার্য মহাশয় রাত বারোটার পর প্ল্যানচেটে বসবেন।শনিবার থেকে সোমবার আমাদের বেশ ঘুড়ে বেড়িয়ে আর ভানুমতীর হাতের সুস্বাদু খাবার খেয়ে ভালো কাটলেও সোমবার রাত থেকে শুরু হল আমাদের সবার মনে ভয়,তুলি ভয়ে ভয়ে আমায় বলে দেখ বাবুনদা জানিনা কাল রাতে আমাদের কপালে কি শনি নাচছে। 
সময় অনুসারে ভোলানাথ আচার্য মহাশয় ঠিক রাত বারোটা বেজে পনেরো মিনিটে প্ল্যানচেটে বসলেন। 
ঘরটি তখন অন্ধকার এবং নিস্তব্ধ,সেখানে শুধু মোমবাতির মৃদু আলো যা ঘরের পরিবেশকে রহস্যময় ও গা ছমছমে করে তুলেছে। এরপর ছোট মামা হালকাভাবে কাস্টারটি স্পর্শ করে মনকে শান্ত রেখে  সিংঘিয়া আর রাজকুমারী রত্নবতীর উপস্থিত আত্মার কাছে প্রশ্ন করা শুরু করলো।এমন সময় সেই অন্ধকার ঘরে হঠাৎ মনে হলো যেন কেউ ছুটে বেড়াচ্ছে কিন্তু কাউকে দেখা যাচ্ছে না।ঘরে হঠাৎ করে বাসনপত্র পড়ে যাওয়ার আওয়াজ পেলাম এছাড়াও ঘরে একটা হিস্ হিস্ শব্দ শুনতে পেলাম, পায়ের উপর মনে হলো কোন কিছু দিয়ে হাল্কা বারি মারছে।ঘরে সবার তখন আত্মারাম খাঁচা অবস্থা,এমন সময় দেখি ভানুমতী কোথা থেকে ছুটে এসে ঘরের আলো জ্বালালো,আলো আসতেই তাকিয়ে দেখি ছোট মামা আর ভোলানাথ আচার্য মহাশয় দুজনেই অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে। ভানুমতী জানালো আসলে রান্নাঘর থেকে কিভাবে দুটো বুনো খরগোশ বেড়িয়ে এসে এই ঘরে ঢুকেছে। এতক্ষনে আমরা বুঝলাম যে এতসময় ধরে ঘরে ওরাই তান্ডব করছিল। ভানুমতী জল নিয়ে এসে ওদের চোখে মুখে ছেটাতে দুজনের জ্ঞান ফিরলো। 
গরম কফি খাওয়ার পর দুজনকে অনেক চাঙ্গা মনে হলো। ছোট মামা এবার তার কাপুরুষতা লুকানোর জন্য আমাদের বললো শোন আসলে কি আমি প্ল্যানচেটের উপর হাত রেখে ওনাদের দুজনের সত্তার সাথে যোগাযোগ করার জন্য ওনাদের নাম মনে মনে  ডাকছিলাম তাই তো ওনাদের উপস্থিতি উপলব্ধি করি আর তোদের কারোর মন স্থির ছিলনা তাই তোরা কিছুই বুঝিসনি। 
তান্ত্রিক ভোলানাথ আচার্য ছোট মামার চেয়ে এক কাঠি উপরে যান, উনি বলেন আমি প্ল্যানচেট শুরু করার পরক্ষণেই বুঝতে পারি যে সিংঘিয়ার অভিশাপে রাজকুমারী রত্নবতী
খরগোশ হয়ে গেছিলেন তাই দেখলে না খরগোশ রুপে সে এখানে উপস্থিত হলো আর ওই যে হিস্ হিস্ শব্দ শুনতে পাচ্ছিলে আসলে সিংঘিয়া ওকে তখন অভিসম্পাত করছিলো আর ওদের দুজনের এই রেষারেষিতে আমাদের প্ল্যানচেট বরবাদ হলো আর ওদের ঝামেলা বন্ধ করতে আমায় অজ্ঞান হবার এই অভিনয় বাধ্য হয়ে করতেই হলো।আমরা সবাই পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছি আর কোনক্রমে হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করছি। 
তুলি হঠাৎ বলে ওঠে সত্যি বাবাজি আপনি মহান,তাহলে আপনার এই সত্য আবিস্কারের কথাটা ঐতিহাসিক মহলে পাঠিয়ে দিচ্ছি,শুনেই তান্ত্রিক ভোলানাথ আচার্য থতমত খেয়ে বলেন আরে এটা কোরো না,আমার আধ্যাত্মিক বল আছে বলে তো আমি ওনাদের এই গোপন রহস্য রাষ্ট্র করে ওনাদের অপমান করতে পারি না,তখন মৌ বলে তাহলে ছোট মামা তোমার নামে পাঠাই, শুনেই ছোট মামা লাফিয়ে উঠে বলে খবরদার ওসব করবিনা, তোরা তো জানিস আমি কোনদিনই যশলোভী নই। 
আমি মুচকি হেসে বলি তোমাদের দুজনের যুক্তিই আমরা বুঝেছি তা ছোট মামা আমাদের ফেরা কবে,ছোট মামা বলে পরশু দিনের ট্রেনে।বাবলু হেসে বলে তবে তো কালকের দিনটা হাতে আছে তাহলে কি বাবাজি কাল আরেকবার প্ল্যানচেটে বসবেন নাকি,শুনেই বিরক্ত হয়ে তান্ত্রিক ভোলানাথ আচার্য মহাশয় বলেন বারবার ওনাদের বিব্রত করা ঠিক নয়। তুলি আমাদের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলে ওনারা কতটা বিব্রত হবেন জানিনা,বাবাজি আরেকবার লেজে গোবরে হবেন এবিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, ওর কথা শুনে আর হাসি চেপে রাখতে না পেরে আমরা সবাই হেসে ফেললাম।

Sunday, August 24, 2025

পারুলের স্বপ্ন -- পারমিতা চ্যাটার্জি

পারুলের স্বপ্ন
পারমিতা চ্যাটার্জি 
২৩/০৮/২৫
মোহন ঘরে ফিরে এসেছে  গিন্নি পারুল আর মেয়ে আলপনা দুজনেই দুরকম কাজে ব্যাস্ত পারুল নামিয়েছে
সবে এক কড়াই তরকারি লোটা মাছের সাথে আলু কুমড়ো  বেগুন দিয়ে পেঁয়াজ রসুন দিয়ে জমপেশ করে বানান খুব গন্ধ বেরিয়েছে। কিন্তু মোহনের মাছের সাথেলের শ অত তরকারি দিয়ে খেতে ভাল লাগেনা। অনেকদিন বউকে বলেছে এরকম করে করবিনা। 
আরে খেতে তো ভাল হয় আগুন বাঁচে মেয়েটাকে শহরে নিয়ে পড়াতে  তো খরচ আছে। পারুলের শখ মেয়েকে খুব শিক্ষিত করে তোলা। 
তারজন্য রোজ এই অখাদ্য খেতে মোটে ভালো লাগে না দুবেলাই এক তরকারি। আমিও তো খাটছি ভালমন্দ খাওয়া রোজ না হলেও মাসে একদিন তে খেতে পারি? 
আরে তোর মেয়ের পড়ার টাকার অভাব হবে না। রাতে মুরগী নিয়ে আসব ভাল করে রাঁধিস আর পাশের বাড়ির বকুল কে একটু দিয়ে আসিস। হ্যাঁ একবাটি তরকারি বকুলকে আমি রোজ দি,
তাইনাকি?  তাইজন্য একরান্না রোজ তা বেশ করেছিস তোর যে মনটা এত বড় তাতো জানতাম না। পারুল বলল, ভাবছি সামনের মাসে আলপনার সাথে বকুলকেও স্কুলে ভর্তি করে দেব,
হ্যাঁ দিস আজকাল মেয়েদের পড়াশোনা খুব দরকার। বিয়ের চেয়েও পড়াশোনার দরকার আরও বেশি। 
পারুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল অত ভাল করে মাধ্যমিক পাশ করলাম কেউ আমার পড়ার জন্য একটুও ভাবলনা।
উফ্ আবার ফ্যাচফ্যাচানি আরম্ভ হল।  তখন বাবা মা ছিল সামনে আমার বোনের বিয়ে ছিল কত খরচা করে বোনটার বিয়ে দিলাম তাও সামান্য রাখী কেনার অপরাধে বোনটাকে আমার মেরেই ফেলে দিল। দাদা দাদা করে পাগল ছিল মেয়েটা এখনও ওর মুখটা মনে পড়লে চোখের জল সামলাতে পারিনা। তখন তোর পড়াশোনা নিয়ে ভাববার মতন মন ছিল আমার। তোমার মায়ের শরীর খারাপ ছিল  বলে আমাকে তো অল্প বয়েসেই বিয়ে দিয়ে নিয়ে এসেছিলে তোমরা। হ্যাঁ তুই আর বনু একসাথে পড়তিস রাতের রান্না মা করতেন,
রাতের রান্না আর কি ছিল শুধু ভাত আর রুটি কখানা সকালেই তো আমি আর বনু সব করে রাখতাম। কাজ তো কম ছিলনা, 
থাক আর হিসাব দিতে হবেনা, 
আচ্ছা আমার বাবা মা তো প্রায় কিছুই দিতে পারেনি, 
আমরা তো চাইনি। আমরা বাপ বেটা ছিল যা আছে তাই  দিয়ে চলবে প্রাণপণ খেটে রোজকার করব কিন্তু চাইব কেন? 
আমার মা খালি কানের একজোরা দুল আর তোমাকে আংটি  আর সবাই  নাকফুল শেষকালে দিদি কেঁদে জামাইবাবুকে বলল, আমাকে মা হাতের গয়না দিয়েছিল আমার বোনটার হাত খালি থাকবে!  তখন প্রায় শেষমুহুর্তে জামাইবাবু দুটো পলারবালা নিয়ে এল আর মামারা ঘড়ার সাথে হলুদ তোলা শাড়ি তার সাথে আর একটা ভাল ঢাকাই শাড়ি একটা আমার হাতে আংটি দিয়েছিল, জামাই বরণ করেছিল রূপোর আঙটি দিয়ে,
আহা মানুষ আর কত দেবে?  অনেক দিয়েছে, 
তাই ভাবি তোমাদের এত উঁচু দরের মন আর তোমাদের বাড়ির মেয়েকেই এমন করে মেরে দিল, ছেড়ে দিলে শয়তানটাকে? ওর ফাঁসি হওয়া উচিৎ ছিল। লড়েছিলাম তো প্রাণপণ আমি আর বন্ধু পলাশ কিছুই করতে পারলাম না। যাক আমার মেয়েকে একেবারে বিএবিটি পাশ করিয়ে সরকারি স্কুলে পরীক্ষার বসাব একবার না হলে বারবার দেবে বিয়ের কথা ভাববোইনা। আর শক্ত করে তৈরি করবে গায়ে হাত তুলতে এলেই চেঁচামেচি হৈচৈ করে আর ওকে তো কুস্তি শিখিয়েছি ও ঠিক বেরিয়ে আসতে পারবে, 
আগে তো বিএটা পাশ দিক তারপরের কথা পরে আর এবারে যারা চাইবে সেরকম ঘরে বিয়ে দেবোই  না। 
মানুষ স্বপ্নের কাজল পড়তে ভালবাসে পারুলও স্বপ্ন দেখে তার মেয়ে স্কুলের দিদিমনি হবে একদিন  তারজন্য তাকে আরও পড়াতে হবে ওই যে দিদিমনি হতে গেলে যে ট্রেনিং লাগে সেই ট্রেনিং। যা তার নিজের একদিন  স্বপ্ন ছিল  হয়নি তার মেয়েকে সে সফল করবেই।  
মাঝে মাঝে উদাস হয়ে ভাবে আর তার মেয়ে কি তার স্বপ্ন সত্যি সফল করতে পারবে, ভাবতে ভাবতেই আবার
 মাংস রান্নায়  মন দিল। অনেক দিন পরে মাংস এনেছে রান্না খারাপ হলে রাগ করবে  মানুষ টা। 
শেষপর্যন্ত আলপনা  বি এ পাশ করল আর বকুলকেও পারুল  মাধ্যমিক পাশ করিয়ে ছাড়ল। ওর মা শহরে যায় 
বাবুদের বাড়ি রান্না করতে। কষ্টে শিষ্টে চলে যায়। 
পারুল আলপনার সাথে বকুলেরও একটা করে জামা করে। তবে এখন আলপনা হয় শাড়ি পড়ে নয়ত সালোয়ার কামিজ পরে। সালোয়ার কামিজই  বেশি পরে। 
বকুলের মা বলল দিদি বকুল কি আর পড়বে?  আমি তো যা রোজগার করি তাতে দুবেলা রান্না জ্বালানি কেরোসিন এসব কিনতেই চলে যায়।
তোমার খালি নেই নেই স্বভাব। আমরা তো দেখি  না না কি?  বকুলের  অত ভাল রেজাল্ট ও পড়বে না মানে?  ও কে পড়তেই হবে। আলপনার সাবজেক্ট ও নিক সব বই পেয়ে যাবে। 
শেষ পর্যন্ত  বকুল উচ্চমাধ্যমিকে আর আলপনা বিএডে ভর্তি হতে হল। 
ওরা দুজনেই দেখেছে ওদের পড়ানোর জন্য মা বছরে দুটোর বেশি কখনও শাড়ি কেনেনি ওদের কলেজ যেতে হত বলে পয়সা বাঁচিয়ে সালোয়ার-কামিজের সেট কিনে দিত। নিজের প্রচণ্ড ইচ্ছে সত্বেও কিছুই করতে পারলনা।
সেলাই করে রোজকার করত শেষপর্যন্ত একে ওকে ধরাধরি করে প্রাইমারি স্কুলে চাকরি নিল সেই সাথে বাড়ির সামনে টা একটু ঘিরে নিয়ে সেলাইয়ের দোকান দিল। ব্লাউজ, সালোয়ার কামিজ , শাড়ির ফলস লাগান, মেয়েদের ফ্রক সেলাই করে মোটামুটি চালিয়ে নিত। মেয়েদুটো সময় মতন সেলাইয়ে মাকে সাহায্য করত। খাওয়াদাওয়ার একটু ভাল ব্যাবস্থা  করতে পেরেছিল পারুল। রাতের বেলায় শুতে এসে বর যখন গায়ে হাত বুলিয়ে  বলত সারাজীবন কষ্ট করেই গেলি, এখন মেয়ে দুটো  মানুষ হলে তোর স্বপ্ন পূরণ হয়। আমার দোকান থেকেও এখন আয় পয় ভালই হচ্ছে এবার থেকে নিজেও একটু ভালো করে খাবি শরীরটা ভেঙে যাচ্ছে তো! 
কিছু ভাঙছেনা তুমি অত চিন্তা কোর না তো। 
আলপনা অনেক দিন ধরে টিউশনের চেষ্টা  করছে পেয়েও গেল কলকাতার কাছেই একটা আর একটা নিজেদের গ্রামে। বকুল উচ্চমাধ্যমিকের সাথে সাথে নার্সিং ট্রেনিং নিতে শুরু  করল তার সাথে সাথে লোকের বাড়ি রক্ত নিতে যাওয়া চ্যানেল করা সেগুলো আবার ল্যাবে দিয়ে আসা আার রিপোর্ট নিয়ে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া এই করে সেও রোজকার শুরু করল। আলপনা বাড়িতে আসার সময় চারজনের চারটে বড় কলা মাখন রুটি সব কিনে আনত। 
খাওয়া দাওয়া ভালোই চলছিল যতটা পুষ্টিকর খাওয়া বাবা মাকে দেওয়া যায় মেয়ে দুটো চেষ্টা করত। 
এইভাবেই দিন চলতে লাগল। আলপনা বুঝতে পারছিল অতিরিক্ত পরিশ্রমে মায়ের শরীর ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। 
সে সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিয়েছিল কিন্তু রেজাল্টের অপেক্ষা না করেই একটা প্রাইভেট স্কুলে ভাল মাইনের চাকরি  নিল। 
বকুলের মা শহরের কোন বাবুর সাথে থাকতে শুরু বকুলের নামে বাড়িটা লিখে দিল। 
বকুল রেগে গিয়ে বলল আমাকে তো চিরকাল তুমিই দেখেছ পারুল মা আজ থেকে  তুমি আমার শুধু মা।
পারুল তার ক্লান্ত দূর্বল  বুকে টেনে নিল। পারুল বকুলকে বলল তুই কতকিছু শিখছিস রে ভাল রোজকার করিস দেখবি পণের জন্যে যেন খুন হতে না হয়। 
বকুল নার্সিং ট্রেনিং থেকে শুরু করে ল্যাব টেকনিশিয়ান হয়ে উঠল। বড় সরকারি হাসপাতালে চাকরি  পেল। জোর করে পারুলকে বলল এবার সেলাই টেলাই বন্ধ কর তো অনেক হয়েছে আমি আর দিদি দুজনেই ভাল চাকরি করছি নাও ওই দুধটুকু খেয়ে নাও না খেয়ে শরীরের যা হাল বানিয়েছ। 
সেদিন সকাল থেকে আকাশটা মেঘলা মনে হচ্ছে যেন ভারি বৃষ্টি হবে, আলপনা খুব তাড়াতাড়ি স্কুল থেকে ফিরছে হাতে তার সরকারি স্কুলের অফার লেটার  এই গ্রামেই পোস্টিং পেয়েছে খুব খুশি সে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করেছে, মায়ের চোখের নীচে গাঢ় কালি পড়েছে মনে হয় যেন স্বপ্নের কাজল পরে আছে। 
আলপনা দৌড়ে দৌড়ে এসে দেখল মা তার সেলাইয়ে ঘরে বসে বসেই যেন ঢলে পড়েছে, ওর পেছনে বকুলও এসে দাঁড়িয়েছে ওদের বাবাও যেন প্রাণপণে কান্না চাপার চেষ্টা করছে, বকুলের অভ্যস্ত চোখ সব বুজতে পারল কাছে এসে পারুলের মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, দিদি মা আর নেই রে মা আর নেই  
আলপনা তখন চিৎকার করে কেঁদে উঠে বলল মা তোমার স্বপ্ন যে সফল করলাম তুমি তোমার জন্য  কিছু করার সুযোগ দিলেনা চলে গেলে। 
পারুলের স্বপ্ন সফল হলে কিন্তু পারুল চলে গেল। পরিবারটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। 

Thursday, July 31, 2025

শ্মশাণে ভুতের ভয় -- অজয় চক্রবর্তী

 শ্মশাণে ভুতের ভয়
 অজয় চক্রবর্তী
 ৩০  ০৭  ২০২৫
গ্রামটার নাম ঝিঙেশালী। বেশ বড়সড় গ্রামটায় সকলেরই চাষবাসের উপর জীবন নির্ভরশীল। বেশিরভাগই মাটির কাঁচা বাড়ি। সারা গ্রামে ঘুরে এলে হাতেগোনা তিন চারটি  দালান বাড়ি দেখতে পাওয়া যাবে। বর্ষাকালে পুরো গ্রামটাই জলের উপর ভেসে থাকে। এখনো বিদ্যুৎ প্রবেশ করেনি। মানুষের অসুখ বিসুখে কবিরাজ, ওঝা এরাই ভরসা। শহর এখান থেকে অনেক দূরে। যাওয়া-আসার জন্য যানবাহনের তেমন সুবন্দবস্তো
নেই। একুশ বাইশ বছর বয়সি অম্লান এই গ্রামেরই ছেলে। নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করে আর এগোতে পারেনি। সব সময়ই অন্যের উপকার করবার একটা ঝোঁক অম্লানের মধ্যে দেখা যায়। পাড়ার বড় দাদাদের সঙ্গেই ওর বন্ধুত্ব। কাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, কার জন্য কবিরাজ ডেকে দিতে হবে ,কার বাড়ির কি সমস্যা সেটা আলোচনা করে মিটিয়ে দিতে হবে এইসব কাজ নিয়েই পাড়ার দাদাদের সঙ্গে মেতে থাকে। যেহেতু ওরা এই কাজগুলো করে থাকে সেহেতু গ্রামের লোকেরাও ওদের ওপর দেশ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
পাড়ার ঘোষ দার পিতৃ পুরুষের বড় বাড়ি। অনেকগুলি ঘর,  বেশিরভাগই খালি পড়ে থাকে কারণ এখন বাড়িতে যা লোক আছে তাকে অত গুলি ঘরের দরকার নেই।
এদিকে অম্লানদের দিনের পর দিন সামাজিক কাজকর্ম বেড়ে যাওয়ার কারণে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবার জন্য একটা স্থায়ী ঠিকানার দরকার । একদিন সকলে মিলে ঘোষ দাকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলার পর ঘোষ দা ওদের একটা ঘর ছেড়ে দিল।
সুধাংশু নিজের বাড়িতে বসে সাইনবোর্ড লেখার কাজ করে, ওকে বলে পরদিন একটা সাইনবোর্ড লাগানো হলো। সংগঠনের নাম দেওয়া হল "আমাদের কাজ"। নিচে লেখা হল বিভিন্ন প্রকার সামাজিক কাজ, সৎকার সহ ,যেকোনো প্রয়োজনে এখানে যোগাযোগ করুন। তারপর থেকে দুই বেলাই পালা করে ওরা এখানে এসে বসতে লাগলো।

সেদিন ছিল শনিবার। নিম্নচাপের বৃষ্টি গতকাল থেকেই শুরু হয়েছে। কখনো জোরে কখনো মাঝারি বৃষ্টি হয়েই চলেছে। সঙ্গে ঝড়ো হওয়া, আকাশ কালো মেঘে ঢেকে আছে, মাঝে মাঝে বীভৎস জোরে বিদ্যুৎ চমকানোর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
গ্রামের পূবদিকে দাসপাড়ায়, অঞ্জলি, বছর  পঁচিশ বয়সের একটি মেয়ে একাই থাকে। কয়েক বছর আগেই বাবা-মাকে হারিয়ে এখন গ্রামের মানুষের সাহায্য সহযোগিতায় দিন চলে যায়। গতকাল রাতে নিজের ঘরে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যার কারণ কেউই কিছু বুঝতে পারছে না। অনেক বেলা পর্যন্ত দরজা না খোলায় প্রতিবেশী কেউ গিয়ে ডাকাডাকি করার পরও কোন সাড়া না মেলায় আরো দু চারজন জুটিয়ে দরজা ভেঙে দেখা গেল অঞ্জলি গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে।।
অম্লান রা খবর পাওয়ার পর সেখানে ছুটে গেল। মেয়েটার সৎকার তো করতে হবে। প্রাথমিক ক্রিয়াকর্মাদি পাড়ার লোকেরা করে দেওয়ার পর দাহ করবার জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার সময় লোক পাওয়া যাচ্ছে না। একদিকে প্রবল বর্ষা, বৃষ্টি হয়েই চলেছে তার সঙ্গে ঝড়ো হওয়া কেউ যেতে চাইছে না। অনেক বলে কয়ে ছয় জনকে রাজি করানো গেছে। অম্লান সহ আরো পাঁচজন এই দুর্যোগের মধ্যেই দেহটা নিয়ে শ্মশানের দিকে যাত্রা করল।

গ্রাম থেকে শ্মশানের দূরত্ব প্রায় ছয় কিলোমিটার। পৌঁছতে পৌঁছতে রাত প্রায় এগারটা বেজে গেল। গ্রামের শ্মশান বলতে একটা ছোট্ট বিচুলির চাল দেওয়া ঘর। পঞ্চায়েত থেকে কিছুদিন আগে করে দিয়েছে। পাশ দিয়ে একটা সরু খাল বয়ে গেছে এই খালের জলেই মৃতদেহের যাবতীয় ক্রিয়া কর্মাধি করা হয়। দুর্যোগ আবহাওয়ার মধ্যেই যেহেতু কোথাও আলো নেই ওরা একটা হ্যারিকেন জ্বালিয়ে কোন রকমে ঢেকে ঢুকে নিয়ে গেছে। অন্ধকার চারদিকে জল থই থই করছে। খালসহ এলাকার সমস্ত জমি জায়গা জলের উপর ভাসছে। সৎকার করতে হলে তো কাঠ চাই আর একজন পুরোহিত চাই। শ্মশানের কাজ আবার সব পুরোহিত করে না তার জন্য অগ্রদানী ব্রাহ্মণ দরকার। একজন আছে কিন্তু তার বাড়ি শ্মশাণ থেকে অনেক দূরে। দুজনের যেতে হবে। কাঠের দোকানও প্রায় দু কিলোমিটার দূরে। এই বর্ষার দিন এতো রাতে দোকানিকে ডেকে তুলে কাঠ আনতে হবে। লোক তো মোটে ছয় জন। কাঠের দোকানে তিন জনকে যেতেই হবে, আর পুরোহিত ডাকতে দুইজন তাহলে মৃতদেহের এখানে কে থাকবে?
অম্লান সবকিছুতেই কোন কিছু না ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বলল তোমরা যাও আমি থাকবো। নিজেকে খুব সাহসী প্রমাণ করার জন্য অম্লান বলে উঠলো আমি পঞ্চাশ টা দেহ দাহ করেছি, আমার অভিজ্ঞতা আছে কোন অসুবিধা হবে না।
আর দেরি না করে তিনজন চলে গেল কাঠ আনতে আর দুজন গেল পুরোহিতের খোঁজে। অম্লান ঘুটঘুটে অন্ধকারে টিমটিম করে জ্বালানো হ্যারিকেনের আলোয় মরা পাহারা দিচ্ছে। যত রাত বাড়ছে দুর্যোগ ক্রমশ বাড়ছে। চারদিকে ব্যাঙ আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে রাতের পরিবেশ ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। অম্লানের কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগলো। মনে মনে ভাবলো আমি না থাকলেই ভাল হত। অন্য কেউ থাকতো। আমি না হয় ওদের সঙ্গে কাঠ আনতে  গেলেই পারতাম। নানারকম আজগুবি গল্প মনের মধ্যে ভিড় করে আসছে। আর মেয়েটার মৃতদের দিকে সামান্য আলোতে তাকিয়ে দেখছে। হঠাৎ খালের জলে কিছু একটা পড়ার শব্দে অম্লান ভয়ে চমকে উঠল। খালের দিকে চেয়ে দেখতে লাগলো। বেশ কিছুক্ষণ কাটবার পর মৃতদেহের দিকে নজর পড়তেই দেখল মেয়েটার বাঁ পা টা নড়ে উঠল। প্রচন্ড ভয় পেয়ে এখন কি করবে বুঝে ওঠার আগেই দেখল এবার মেয়েটার পেটের নিচটা নড়ে উঠলো। ভয়ে অম্লানের হাত-পা অসাড় হয়ে যেতে লাগলো। তারপর দেখল মৃতদেহের পেটটা বেশ নড়াচড়া করছে। ক্রমে  দেখল বুকটা জোরে জোরে ওঠানামা করছে। অম্লান ভয়ে বাবাগো বলে চিৎকার করে যেই দৌড়ে পালাতে যাবে অমনি কে যেন ওর ডান পা দুহাত দিয়ে চেপে ধরেছে। দৌড়াতে গিয়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল।
ভোর হয়ে গেছে। দুর্যোগ কিছুটা কমেছে। অম্লান তাকিয়ে দেখল নিলয় দা, রহিম দা, কালু দা, গোপাল দা, বাবলু দা সবাই ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। অম্লানের সারা গা ভেজা, চোখ মুখ ভেজা, মাথা ভেজা, মৃতদেহটার কাছাকাছি শুয়ে আছে। আস্তে আস্তে উঠে বসার পর অম্লানকে জিজ্ঞেস করায় গতকাল রাতের পুরো ঘটনাটা খুলে বলল। বাবলুদা বলল তোর বাঁ পাশে দেখ। অম্লান তাকিয়ে দেখলো একটা ভীষণ মোটা জলঢোড়া সাপ মরে পড়ে আছে।।
নিলয় দা বলল বর্ষায় চারিদিকে জলে ভরে গেছে রাতের অন্ধকারে এই সাপটা উঠে এসে মেয়েটার শরীরে ঢাকা দেওয়া চাদরের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল। অন্ধকার আর ঝড় বৃষ্টির তাণ্ডবে দেখতে পাসনি। ভয় পেয়ে দৌড়ে পালাবার সময় কেউ তোর পা টেনে ধরেনি। অসাবধানতায় বাঁশের চিতায় তোর ডান পা টা আটকে গিয়েছিল।আমরা ফিরে এসে তোকে এই অবস্থায় দেখে চোখেমুখে,মাথায় জল দিয়ে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি।
ক্রমশ সকাল হয়ে এল এদিকে কাঠ সহ যা কিছু সামগ্রি সব আনা হয়ে গেছে। পুরোহিত মশাই তার যা ক্রিয়াকর্ম করে দিয়ে রাতেই চলে গেছে। এখন সকলে মিলে অঞ্জলি র দাহর ব্যবস্থা করতে লাগলো।

Friday, November 8, 2024

হিমু - শিবপ্রসাদ মন্ডল

  হিমু
   শিবপ্রসাদ মণ্ডল
    ৭/১১/২৪
মলয়, মহুয়া ও মমতাজ প্রথম শ্রেণী থেকেই একসাথে পড়াশুনা করতো ওদের গ্ৰামের বিদ্যালয়ে।উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর--মহুয়া ও মলয় কোলকাতায় ডাক্তারি পাশ করে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার হয়েছে। 
মমতাজ ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ. ; পি.এইচ.ডি, করে এক মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজ শুরু করেছে।
মলয়কে নিয়ে মহুয়া ও মমতাজ দুজনেরই মনের গভীরে দুটি প্রেমের চারাগাছ জন্ম নিয়েছে,তা' কেউ কাউকে জানতে দেয়নি।মলয়-মহুয়া হিন্দু বাড়ির ছেলেমেয়ে কিন্তু মমতাজ মুসলিম বাড়ির মেয়ে, তাই তার প্রেম নীরবে নিভৃতে কাঁদে।মলয়কে কোনোদিন কোনোকিছুই বলে উঠতে পারেনি।
গত ফাল্গুনে মলয়ের সাথে মহুয়ার বিয়ে হয়ে যায়। মমতাজ বৌভাতের দিন এসে দুটি ফুলের তোড়া , দুটি আংটি ও একটি পুতুল উপহার দিয়ে চলে যায়।
এ বছর মলয় ও মহুয়া গ্ৰামের বাড়িতে পুজোর ছুটি কাটাবে বলে একটি গাড়ি ভাড়া করে গ্ৰামে ফিরছে, ঐ সময় মহুয়া ছয় মাসের গর্ভবতী।
হঠাৎ ওদের গাড়ির সাথে এক বড় ট্রাকের ধাক্কা লাগলো। ওদের গাড়ি দু'বার পাক খেয়ে পাশের খালে পড়ে গেলো।প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে মহুয়ার অসহ্য পেটের যন্ত্রনা শুরু হলো। 
অন্য একটি গাড়ি ভাড়া করে মলয় দ্রুত ওকে জেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলো। ডাক্তার অপারেশন করে জানান যে মহুয়া এ জীবনে আর মা হতে পারবে না !!
হাসপাতাল থেকে মহুয়া ফিরে আসতেই মমতাজ ওদের বাড়িতে দেখা করতে গিয়ে দেখে-- মলয় চোখের জল ফেলতে ফেলতে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে আর মহুয়ার চোখ দিয়ে জল ঝরতে ঝরতে বালিশ ভিজে গেছে। 
বারবার প্রশ্ন করে মমতাজ সবশেষে জানতে পারে যে মহুয়া এ জীবনের মতো গর্ভধারণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।
হঠাৎ মহুয়া--মমতাজের দেওয়া বৌভাতের দিন সেই পুতুলটা তারই কোলে রেখে বলে," তুই এতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা কর।তুই ছাড়া এই কাজ আর কারো দ্বারা সম্ভব হবে না।"
মমতাজ অতি বুদ্ধিমতী, তার উপর ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপিকা। মহুয়ার অন্তরের কথা তার আর বুঝতে বাকি রইলো না।
মহুয়া আইনের সাহায্য নিয়ে মলয়ের সাথে মমতাজের বিয়ে দিয়ে একসাথে তিনজন থাকতে শুরু করলো এবং এক বছর বাদে মমতাজের কোল আলো করে এক পুত্রসন্তানের জন্ম হলো।
মহুয়া নিজেই সন্তানের নাম রাখলো-- হিন্দু ও মুসলমান এই দুটি শব্দের প্রথম অক্ষর নিয়ে "হিমু"।
        এমনটা তো হতে পারতো -- মলয় মহুয়াকে ছেড়ে আবার বিয়ে করেছে, মহুয়া মলয়কে ছেড়ে আত্মহত্যা করেছে, মহুয়া-মলয় দুজনেই সবকিছু ছেড়ে কাশীবাসী হয়ে গিয়েছে, মহুয়া মলয় দুজনেই আত্মহত্যা করেছে, মমতাজ  মহুয়ার কথা না বুঝার ভান করে নিজের মতো পাত্র দেখে  বিয়ে করেছে। কিন্তু এসবের কিছুই হয়নি বরং একটি comi-tragedy -- সুন্দর একটি পরিণতি নিয়ে tragi-comedy তে পরিণত হয়েছে।
ওরা সকলেই উচ্চশিক্ষিত এবং উচ্চশিক্ষিতা। সর্বোপরি ওরা জাতি ,ধর্ম ও বর্ণের গন্ধ লাগা কলুষিত পোশাক খুলে ফেলে এবং ঘুণধরা সমাজের নানান বিভেদ প্রাচীরগুলোকে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে এক নতুন আলোর পথের সন্ধান পেয়ে সুন্দরতম জীবনের ঠিকানা নিজেরাই খুঁজে নিয়েছে।
আসুন না, আমরাও সবাই মিলে চেষ্টা করে দেখি-- সমাজের পচা,গলা, দূষিত এবং বিষাক্ত ঘা-গুলোকে প্রীতির ঔষধ প্রয়োগ করে সারিয়ে তুলতে পারি কিনা!!!
ওরা যখন পেরেছে আমরাও নিশ্চয়ই পারবো।
তবে নেশার কাজল চোখে লাগাতেই হবে!!
যাঃ-- অনেকক্ষণ বকতে বকতে হিমু ও তার পরিবারের কথা ভুলেই যাচ্ছিলাম। 
মলয়, মহুয়া ও মমতাজের অভিনব সিদ্ধান্তের জন্য-- ওদের জানাই উষ্ণ অভিনন্দন।আর ছোট্ট সোনা 'হিমু'র জন্য এক সমুদ্র ভালোবাসা।

Friday, October 4, 2024

দুর্গার মর্ত্যে আগমন -- অরবিন্দ সরকার


   রম্যরচনা 
   দুর্গার মর্ত্যে আগমন
   অরবিন্দ সরকার 
    ৩০/০৯/২০২৪
এই যে নাথ মর্ত্যে চললাম। তাকাবার জো নেই। একবার চেয়ে দেখো? একেবারে ন্যাংটা কোথাকার? নেশায় গদগদ, দেখার ক্ষমতা টুকুও নাই । দেখি এবার একখানা পরিধান তোমার নিয়েই ফিরবো। পুরুত সব নিয়ে নেয়,আমার পরিধান সেটাও খুলে নেয়। যেভাবে আসছি সেভাবেই ফিরে যেতে হবে। আয়রে গনেশ কার্তিক লক্ষ্মী সরস্বতী। তাড়াতাড়ি পা চালা , মহালয়ার মধ্যে মর্ত্যে পৌঁছাতে হবে।
কার্তিক এবার তোর বয়স হয়েছে যথেষ্ট, ময়ূর ছেড়ে ময়ূরীর খোঁজ করবি বুঝলি? কতো জন প্রেম করে বিয়ে করে ফেললো,আর তুই অকেজো কোথাকার? মোবাইলে ভুল ভাল মিস কল দিবি যেখানে সেখানে। তারপর কোনো কুমারীর কণ্ঠস্বর শুনতে পেলে, ইনিয়ে বিনিয়ে শুরু করবি। তোর চেহারা দেখলে প্রেমে পড়তে বাধ্য। ভুলেও বলবিনা বাবার নাম? তাহলে বিয়ে হবে না। এতো বড়ো সংসার চালাতে আমি আর পারছি না। যদি তোকে ঘরজামাই থাকতে হয় তাও থাকবি, আমাদের সময় বুলাদি ছিলো না। থাকলে কি এতো বড়ো সংসার করতাম? লক্ষ্মী বললো- তাহলে আমরা অপয়া বলো? 
অপয়া কেন হবি? তোর লক্ষ্মীর ভাঁড়ার নামে সবার ভাঁড়ার পূর্ণ হচ্ছে,আর তোর কলসী শূন্য। সবাই লুটে পুটে খাচ্ছে। টাকায় কিনা হয়- মর্ত্যে মেয়েরা কিছুই করছে না,সব কাজ করাচ্ছে তাদের বরকে দিয়ে! পান খাচ্ছে,পা টিপে নিচ্ছে, সিনেমায় যাচ্ছে, আবার সিগারেট ফুঁকছে? এবার তুই বলবি গাঁয়ের প্রধানকে, আমার নাম ভাঙিয়ে খাচ্ছো আর আমি পাচ্ছি না। দেখবি তোর নাম উঠে যাবে। তখন তুই মর্ত্যে থেকে যাবি। আমার অনেক চাপ কমে যাবে। তবে সাবধানে থাকবি? ওখানে মেয়ে পেলেই অসুরেরা ধর্ষণ করার চেষ্টা করে। অবশ্য ধর্ষনের মৃত্যুতে বিশ লাখ টাকা দেয়। তুই তো টাকা নাড়াচাড়া করতে পারবি না,ও টাকা আমিই পাবো। ওখানে মরলে লাভ আছে, তবে কিছুটা কাটমানি দিয়ে পেতে হয়। মদ খেয়ে মৃত্যু তাতেও টাকা। অপকর্ম করলে ছোট ছোট শিশুদের কাজ বলে উকিল নিয়োগ প্রশাসন করে তার সাতখুন মাফ। বেশিরভাগ লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়! পঁচাত্তর পঁচিশের ভাগ দিতে হয় ।
সরস্বতী তোকে নিয়ে আমার চিন্তা নাই। তিন বছরে হাতে খড়ি, তারপরে স্কুল গেলেই ম্যাট্রিক পাস,পাশ ফেল নাই। তারপর সেলামি বা উপঢৌকন দিলেই একেবারে মাষ্টারী। সৎসঙ্গে স্বর্গ বাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। তাই মূর্খের পাঠশালায় মূর্খরা কি পড়াবে। যতো মূর্খ থাকবে ততো শাসকের সম্পদ। তোর বীনা ফেলে দে? গান গেয়ে কি হবে? জ্ঞানী গুণী কীর্তন্যা, এরা সবাই উচ্ছন্যা! এইসব পূর্বপুরুষের কথা, এগুলো মেনে চল তাহলে বড়ো হতে পারবি। যেমন তেমন চাকুরী ঘি ভাত। সমাজের কারিগর সেজে সিংহাসন লাভ। একেবারেই রাম রাজত্ব, কতো সীতা, কতো রাম গড়াগড়ি খাবে চাকুরীজীবীর পায়ের তলায়।
এই যে আমার গোবর গণেশ! একে নিয়েই আমার সমস্যা। দোকান খুলেই বাটখারায় জল,ধূপধূনা সহকারে গণেশ বন্দনা করে সবাই ফুলে ফেঁপে ভোম্বল কলাগাছ। এটা হয়ে রইলো শিখণ্ডী। সবার ভূড়ি মোটা হচ্ছে খেয়ে, কেউ কয়লা, কেউ গরু, কেউ কাটমানি, ঘুষ,বালি, রেশনের মাল মেরে পেট ভর্তি। অতশত টাকা,টাকার কুমির সব। পরকীয়া করছে,টাকার গদি , টাকার বালিশে শুয়ে। আমার পুজো তাতেও ভর্তুকি পঁচাশি হাজার টাকা। আগে চাঁদা তুলে পুজো হতো , এখন সব সরকারি খরচ। ঢাকের তালে কোমর দোলে , মদমত্ত হয়ে ডিজের বিকট আওয়াজ। আর তুই দেখ? দেখলেও খরচা আছে? তোর ট্যাকে কিছু গুঁজে রাখতে হবে। যতো মরণ আমার, ভাবতে ভাবতে আবার সেই শিবের শিবিরেই ফিরে যেতে হবে। এখানে বিধবারা ভাতার পাচ্ছে আর আমারটার মরণ নাই। দেশ দুনিয়ায় কতশত মরছে কিন্তু এই নামুন্যা কবে আর মরবে? মনে তো হয়না যে মরবে? এর চারিদিকে গ্যাজ বেড়িয়ে ফুটপাত শিব,বট শিব,নিম শিব,পাতাল শিব,নটরাজ, শ্মশান, বোল্ডার শিব হয়ে অনন্ত কাল বেঁচে রবে। আমার আর ভাতার খুঁজে লাভ নাই। এ মনে হয় আমাকে উলু দিয়ে এনেছে আর হরিবোলেই ছাড়বে?

Saturday, August 10, 2024

কেল্লাফতে ঠাকুর -- স্বপন কুমার দাস

কেল্লাফতে ঠাকুর
স্বপন কুমার দাস 
০৯/০৮/২০২৪
সামনের দিকে যত এগোচ্ছি তত কানে আসে তমসাছন্ন আঁধার দ্বীপের রোদন! ঘোর সন্ধে বেলা সকলের বাড়ির সামনে তুলসীমঞ্চে রাখা প্রদীপ গুলো দিপদিপ করে জ্বলছে, কেউ আবার দেখি পুরো নিভে বসে আছে।
আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি নভ মন্ডলের গ্রহ তারা নক্ষত্র সবার আঁধারে অবস্থান।প্রথমে ভাবলাম  আজ বুঝি অমাবস্যা। কিন্তু না,হঠাত মনে পড়ে গেল আজ তো উষা লগ্নে বেরোবার আগে পঞ্জিকা দর্শন করে বেরিয়েছি, তখন পঞ্জিকা পাঠে দেখলাম আজ  রাখী পূর্ণিমা।
সেই জন্যই তো কয়েক গাছা পৈতে আর রাখী নিয়ে বেরিয়েছি আমার দুরের কিছু জজমান বাড়ির উদ্দেশ্যে।কোনোরকম পৌঁছে গেলে, যে দশ বারোটি জজমান বাড়ি আছে তাতে ভালো রকম দাউ মারা যাবে।
তা আর হচ্ছে না বাদ সাজলো আবার রিমঝিম টিপটিপ ঝরঝর বর্ষণ।আঁধার পথ জোর কদমে বামুন চালে চলাও মুশকিল। যেতে যেতে আবার কিছুটা মেঠোপথ দুইধার ধানজমি জেগে। আদ্বিকালের ঠাকুদা আমলের পুরাতন ছাতা,ছাতার কাপড়ের মধ্যে যত্রতত্র ছোট্ট ছোট্ট ছিদ্র তার ভিতর দিয়ে পড়ছে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির জল আমার তেল চকচকে সুন্দর মাথার টাক টিকে ভিজাচ্ছে।
কনোমতে ঝিঁঝি পোকার ডাক ব্যঙের গ্যঙর গ্যঙর মকমক শব্দ সাপের ফোঁস ফাঁস আওয়াজ উপেক্ষা করে বুকে সাহস নিয়ে রাম নাম জপতে জপতে এগিয়ে চলেছি।
অবশেষে অনেক ধকল সয়ে গাঁয়ের প্রারম্ভে একটি ঝুপড়ি বাড়িটিতে উপস্থিত হলাম। ঐ বাড়িতে পৌঁছে দেখি বাড়িময় অন্ধকার, ঘরের ভিতর দিকে একটি লন্ঠন দিপদিপ করে জ্বলছে।কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম কোন মানুষের সাড়া নেই।তারপর ডাকতে ডাকতে বাড়ির বারান্দা পর্যন্ত এলাম, বলি কেউ আছেন?
দুই চারবার ডাকার পর একজন ঘরের ভিতর জ্বলতে থাকা শিশপড়া লন্ঠন হাতে কাশতে কাশতে বেরোলেন। আমার মুখের ওপর লন্ঠন টি ধরে জিজ্ঞেস করলেন কাকে চাই?
আমি বললাম রমেন বাবুর বাড়ি যাব উনার বাড়িটা ঠিক ঠাওর করতে পারছিনা ঘন অন্ধকারে গোটা গ্রাম ভরে আছে?উনার বাড়িটি কোন দিকে একটু পথটা দেখিয়ে দিন তো? আমার নাম ভজহরি ভট্টাচার্য আমি পৈতে ও রাখি নিয়ে এসেছি উনার বাড়িতে যাব।মুখের  কথা শেষ হতে নাহতেই উত্তর এলো!
রমেন বাবু বলে তো এখানে কেউ থাকেন না আমার নাম তো রফিক মিঁয়া।আমি এই বাড়িতে একাই থাকি আমার মরলে জল দেওয়ার মতো সাত পুরুষের কেউ নেই!সবাই ওলাওঠা রোগে একে একে এই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে আল্লাহর দরবারে, আমি পড়ে একা পুরো গ্রাম ফাঁকা। কোনোরকম পাশের গ্রাম থেকে চাল আলু চেয়ে ভাতে ভাত করে খেয়ে বেঁচে বর্ত্তে আছি বাবু!আল্লাহ আকবর আমার মতো পাপীপেট কে কেন যে বাঁচিয়ে রেখেছেন তার উত্তর আমি পাইনা।
আপনি মনে হয় বাবু ভুলকরে অন্য গাঁয়ে ঢুকে পড়েছেন। 
এটা কোন গ্রাম বাবু?
এটা সিরাজগঞ্জ বস্তি, আগে এখানে অনেক লোকের বাসছিল এখন সব বাড়ি ভুতড়ে বাড়ি হয়ে গেছে।বললাম না ওলাওঠা রোগে পাঁচ ছয় মাস আগে সবাই আল্লাহর দরবারে শিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে..!!
আমি কেবল একা রাজরোগের সাথে বন্ধুত্ব করে বেঁচে আছি।খুঁক! খুঁক! খুঁক! আমার সাতকুলের কেউ নেই। 
আপনি কোন গ্রামের খোঁজে এখানে এসেছেন বাবু?লোক টি কাশতে কাশতে জিজ্ঞেস করল। 
সুন্দরপুর। 
এটা সুন্দরপুর গ্রাম তো?
না বাবু সুন্দরপুর এখান থেকে চারক্রোশ রাস্তা। আপনার গ্রাম কোথায় বাবু?খুঁক! খুঁক! খুঁক! 
আমার গ্রাম কল্পতরু গ্রাম। 
সেওতো চারক্রোশ ধারাধারি!প্রতিটি কথার ফাঁকে কাশির আওয়াজ খুঁক! খুঁক! খুঁক!
আচ্ছা এসেই যখন পড়েছেন, তাহলে রাতটুকু আমার এই গরীবের দুয়ারে কাটিয়ে আগামীকাল ভোরে আবার আপনার গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিবেন।খাওয়ার কিছু ব্যবস্থা করতে পারবনা বাবু তবে, আমাকে একজন ঈদের সময় নতুন বিছানা বালিশ দান করে ছিল সেইটা আমি ব্যবহার করার সুযোগ পাইনি আপনি ঐটা পেতে ঘুমিয়ে পড়ুন। 
না ও সম্ভব না আমাকে আজই ফিরতে হবে আমার বাড়িতে আমার স্ত্রী একা ও আবার আমার পথ চেয়ে বসে থাকবে।না ফিরে ওর আবার চিন্তা বাড়িয়ে লাভ নেই। বরঞ্চ ভুল করে এসেই যখন পড়েছি তখন তোমার ডান হাতটি বাড়াও তো বাপু। 
এই বলে বামুন তার হাতে একটি রাখী বেঁধে দিল আর বললো তিনদিন তোমার হাতে এই রাখী বাঁধা থাকবে চতুর্থ দিন ভোরে কোন নদী বা খালের জলে একে ভাসিয়ে একটি মাত্র ডুব মারবে তারপর বাড়ি ফিরে তোমার নামাজ পড়বে।
এই বলে বামুন ফিরলো বাড়ি।
 তিনদিন পর বামুনের কথামতো সমস্ত কর্ম পালন করলো। 
সব নিয়ম করে সবকিছু করার পর হঠাৎই বুঝতে পারে তার শরীর সুস্থ সে আর খুক খুক কাশেও না।
তখন সে ভাবলো আল্লাহ আকবর মনে হয় কল্পতরু গ্রামের মহান সেই বামুন ঠাকুরকে আমার রাজরোগ ভালো করার জন্য উনাকে ভুলে পথে পরিচালিত করে আমার বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন। 
তৎক্ষণাত সে কল্পতরু গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।পৌঁছে  বামুন ঠাকুরের পা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো ঠাকুর আমি আজ সুস্থ আল্লাহ আকবর আপনার দোয়া করুন। এইবলে বামুনের পাদুটি জড়িয়ে ধরে লুটোপুটি করতে লাগলো।
এদিকে বামুন ভাভছে...
আমি এতটাই টাকা রোজগারের ভাবনায় মশগুল ছিলাম পথ চিনতে ভুল করলাম...!!
নাকি! ঈশ্বর আমাকে এই রাজরোগ গ্রস্থ লোকটিকে সুস্থ করার জন্য, ঈশ্বরের কোনো অদৃশ্য শক্তি আমাকে পরিচালনা করে সেই পথে নিয়ে গেলেন।
বামুন ঠাকুরের বাড়িতে উপস্থিত গ্রামবাসীরা স্তম্ভিত হয়ে সেই দৃশ্য দেখে অবাক নয়নে তাকিয়ে রইল। 
সেই দিন থেকে গ্রামের সকল লোক ভজহরি ঠাকুর কে কেল্লাফতে ঠাকুর নামে ডাকতে লাগল এবং উচ্চস্বরে দুবাহু তুলে জয় কেল্লাফতে ঠাকুরের জয় বলে উন্মাদনায় নাচতে লাগল।।
                     

Friday, July 12, 2024

তাতিনী -- গৌতম তরফদার

 তাতিনী 
 গৌ ত ম  ত র ফ দা র 
 ১০.০৭.২০২৪
            দীর্ঘ চব্বিশ বছর পরে নিজের জন্মভূমি মালদা জেলার অজ পাড়াগাঁ কান্তিপুরে এসে পৌঁছাল ছেচল্লিশ বছরের বিপত্নীক হরিনীল বর্ধন। সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে সারাদিনে একবার চলা রেলগাড়ির শেষ বগি থেকে কান্তিপুর স্টেশনে নামতেই যেন ঘন অন্ধকার তার দিকে ধেয়ে এল। সদ্য বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা যেন আঁধার রাতের নিমন্ত্রণ নিয়ে হাজির। রাস্তাঘাট আজও কোথাও এবড়োখেবড়ো, কোথাও বেশি বেশি গর্ত, বিদ্যুতের খুঁটি উপস্থিতির জানান দিলেও সারাদিনে বিদ্যুৎ দু'ঘন্টাও থাকে না। ছেড়ে যাওয়া গ্রামের আনাচেকানাচে কোথাও উন্নতিলাভের চিহ্ন নেই। গ্রামের বনেদি বাড়ির দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা সাধাসিধে বিচিত্র বিশ্বাস ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে ছেলের ঘোড়ার গাড়ি পাঠিয়েছে। বৃষ্টির কারণে গাড়ি চারিদিক ঢাকা। গাড়ির চালক অল্পবয়সী বিচিত্র বিশ্বাসের ছেলে।

        ছেলেটি পটাপট মালিকের দুইটা সুটকেস গাড়িতে তুলে নিতেই ঝমঝমিয়ে আবার বৃষ্টি শুরু হল।
হরিনীল তড়িঘড়ি ঘোড়ার গাড়িতে উঠতেই দেখতে পেল আগে থেকেই পুরোপুরি ঘোমটায় এক মহিলা ঘোড়ার গাড়ির ভেতরে বসে আছে। হাতে একটা ছোটো বোচকা। ছেলেটি চলতে চলতে বলতে থাকলো.....

         --- এই দিদিটাও নাকি আমাদের গ্রামেরই। অনেক বছর আগেই চলে গিয়েছিল। আজ আপনার সাথেই একই ট্রেন থেকে নেমেছে। গ্রামে যাওয়ার গাড়ি নেই, তাই তারে তুলে নিয়েছি।

       --- ঠিকই করেছো

প্রত্যুত্তরে হরিনীল বললো।

       চলতে চলতে হরিনীল মহিলার মুখটা দেখতে চাইলো... কথা বলতে চাইলো.... একই গ্রামের যখন কোনো পরিচিতাও হতে পারে। কিন্তু না, ঘোমটা বা মুখ কোনোটাই খুললো না।

       গ্রামে ঢোকার মুখে বৃষ্টির প্রাবল্য দেখা দিলেও মহিলাটি ঘোড়ার গাড়ি থামিয়ে নীরবে নেমে গেল। আশ্চর্য!  এখানেই তো হরিনীলের স্মৃতিবিজড়িত প্রেমিকা তাতিনী তালুকদারের বাড়ি ছিল। ভালোবাসা... গোপন অভিসার... দুই পরিবারের তীব্র আপত্তি... চুপিসারে লুকিয়ে গ্রামের পশ্চিমে অবস্থিত কালীমন্দিরে গিয়ে মালাবদল...সিঁদুর দান করার পরই তাদের জীবনে সিঁদুরমেঘ দেখা দিয়েছিল।
গ্রাম্য সালিশিতে দু'জনকেই ব্যাপক মারধোর... সেই রাতেই আপন দাদার হাতে তাতিনীর নৃশংসভাবে খুন হওয়া....হরিনীলের কান্তিপুর গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়া কোলকাতার মেসবাড়ি। সেখানেই পড়াশুনো শেষে সরকারি চাকরি পাওয়া... বাড়ি করা....তাতিনীকে ভুলতে না পারা.... পুনর্বার বিয়ে না করায় অনড় থেকেছে।

        বাড়ি দেখভাল করা বিচিত্র বিশ্বাস, তার স্ত্রী ও তাদের ঘোড়া গাড়ি চালানো ছেলে খুব খাতির-যত্ন করে রাতের খাবার খাইয়ে আগে থেকেই পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখা হরিনীলের আপন ঘরেই বিছানা করে দিল রাতের জন্য।

        গভীর রাত পর্যন্ত অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগলো হরিনীল। এই ঘরেই তো চুপিচুপি তাতিনীকে প্রথমবার নিয়ে এসেছিল বিয়ে করার রাতে। অসমাপ্ত ফুলসজ্জার অতৃপ্ততা আজও কষ্ট দেয় হরিনীলকে।

        বৃষ্টি মুখর গভীর রাতে দু'চোখ বন্ধ করে ঘুমে জড়িয়ে পড়তেই হঠাৎ অস্ফুট আওয়াজে মায়াবী নীলাভ আলো হাতে কে যেন হরিনীলের দিকে এগিয়ে এল। কাছে আসতেই অবাক! আরে!  এ তো ঘোড়ার গাড়িতে বসা সেই নারীর মুর্তি! ঘোমটা সরতেই হরিনীল শিহরিত। একি! এ তো তার তাতিনী! আবছা আবছা হাসিমুখ। হরিনীলের বাস্তবজ্ঞান হারালো.... তাতিনীকে বারবার নাম ধরে ডাকলো.... ছুঁতে চাইলো...হাসি ও কান্নার শব্দ একসাথে এল... নীল আলোটাও নিভে গেল... হরিনীল জ্ঞান হারালো।

      পরদিন সকালে হরিনীল দেরিতে দরজা খুলতেই দেখে বিচিত্র বিশ্বাস ও তার স্ত্রী উদ্বিগ্নচিত্তে তার জন্য অপেক্ষা করছে। সঙ্গে পাড়ার আরও কয়েকজন মহিলাদের জটলা। রাত্রে হরিনীল বারবার তাতিনীর নাম ধরে ডাকছিল আর গোঙাচ্ছিল। আশেপাশের সবাই জানে অতৃপ্ত তাতিনীর আত্মা প্রতি রাত্রেই বর্ধনদের বাড়িময় ঘুরে বেড়ায়। আজ হরিনীলকে কাছে পেয়ে কাছে আসতে চাইছিল, নিজের করে পেতে চাইছিল। কপালজোরে বেঁচে গেছে হরিনীল।

       হরিনীলের আপত্তি স্বত্বেও দুপুরে গ্রামের মাতব্বরদের আয়োজনে গ্রামের পশ্চিমে জাগ্রত কালীমন্দির সংলগ্ন ঘাটে সাধুসন্ন্যাসী ডেকে পুজো ও তাতিনীর পিন্ডিদানের ব্যবস্থা করা হয়।

     লৌকিক বনাম অলৌকিকের বহুযুগের বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের গোলমেলে আচার-আচরণে হরিনীলের দু'চোখ জলে ভরে এল প্রিয়তমা তাতিনীর জন্য। ঈশ্বরের কাছে ওর চিরশান্তি কামনা করলো।


Tuesday, May 14, 2024

ছোটগল্প -- সুমন

ছোটগল্প
  সুমন
১৩.০৫.২০২৪
তোমার ছবিতে একটা ছোটগল্পের রসদ খুঁজে পেয়েছি,
যেখানে তোমার আমার জীবনের হিসেবে মিল দেখেছি,
অতঃপর, যেদিন প্রথম সমুখে অকস্মাৎ এসে দাঁড়ালে,
মুখোমুখি, চোখের ইশারায় পবিত্র প্রেমের জোয়ারে ভাসালে।
তোমার দু'চোখে আরেকটা আস্ত পৃথিবীর দিশা পেয়েছি,
উথালি পাথালি প্রেমময়ী উষ্ণতার পারদে হৃদয় মেলেছি,
চাহনি টেনেছে সমুদ্রতটে আছাড়ি বিছারি সাঁতারে উথলি,
নৌকা বিহারে হৃদয়ের অলিন্দে ভুলিয়েছো মান সকলি।
সেদিনই তোমার জীবনের উপাখ্যান আকুলতা নিয়ে শুনেছি,
হৃদয় উজাড়ি উদ্বেলিত মনপ্রাণ তোমাতেই আমি সঁপেছি,
খানিকটা ঋণের বোঝাও হয়তোবা আপনার করে বুঝেছি,
প্রাণপ্রিয়া তোমায় অন্তরের অন্তঃস্থলে পবিত্র আসনে বসিয়েছি। 
তোমারই পরশে উদ্ভ্রান্ত পাগলপারা প্রেমের আগুন জ্বেলেছি,‌
পাহাড়িয়া শীতলতা উপেক্ষা করেই সারারাত আমি জেগেছি,
আঁধারি নিশীথে জোনাকির আলোয় প্রেমের সাহিত্যে ভেসেছি,
লায়লা মজনুর রূপকথার ন্যায়, ছোটগল্পে কলম ধরেছি।
ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যে যেমনটা ভাবা, তেমনই থামতে শিখেছি,
ডাইরির পাতায় শেষাংশে তথাপি তোমারই কবিতা লিখেছি,
'শেষ-হয়েও-যেন-হইলো-না-শেষ', এমনই যবনিকা টেনেছি,
ক্ষমিও আমারে, ওগো সুচরিতা, ছোটগল্পের গান গেয়েছি,
আগামীর পথে, রেখো মোরে সাথে, তেমনই আস্থা রেখেছি।

Friday, January 5, 2024

শেষবেলার শাহজাহান -- গৌতম তরফদার

 শেষবেলার শাহজাহান
 গৌতম তরফদার
 ০৫.০১.২০২৪
" পাঠশালার খোলামাঠে হেসেখেলে শৈশবসঙ্গী সেখ শাহজাহানের সাথে দিন কাটানো সমর্পণ বসুর ছোটোবেলা - বড়োবেলা একসূত্রে গাঁথা। দু'জনের আজীবন বন্ধুত্বের বন্ধন। পড়াশুনার কারণে একসময় দু'জনের শারীরিক ছাড়াছাড়ি হলেও দু'জন দু'জনের খোঁজখবর রাখে, খুঁটিনাটি জানে-বোঝে। 

            শাহজাহান জমিদারবাড়ির একমাত্র সন্তান। জমিদারতন্ত্র কবেই বিদায় নিয়েছে কিন্তু সেখ পরিবারের ঠাটবাট এখনও কিছুটা হলেও চলমান। শহর থেকে স্নাতক পাঠক্রম শেষ করেই গ্রামে ফিরে গেছে জমিজমা - চাষাবাদের বিপুল কর্মযজ্ঞে। শাহজাহানের অন্তর জুড়ে গ্রামেরই অতি সুন্দরী নিয়ালি খাতুনের বসবাস। তাদের দু'জনের মধ্যে পরিচয় - যোগাযোগ - ভালোবাসারর সম্পর্ক গড়ে ওঠার প্রধান কারিগর বন্ধু সমর্পণই। সম্পর্কের শুরুতেই ভালোবেসে শাহজাহান নিয়ালির নাম রেখেছে বনান্তিকা।

            প্রথমার্ধে শাহজাহানের পরিবারের আপত্তি থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে ধুমধাম করে প্রায় জমিদারি মেজাজেই সাদি হয়ে যায় দু'জনের। সংসারজীবন শুরু.....গভীর মনোযোগে সংসারধর্ম পালন....পরপর তিন পুত্র সন্তানের জন্ম....তাদের বড়ো হয়ে ওঠা..... নিয়ালির ইচ্ছে ও অনুরোধে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে নিয়ালি ও শাহজাহানের নামে কেনা জায়গায় বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তোলা.... শাহজাহানের ইচ্ছেতে বৃদ্ধাশ্রমের নাম রাখা 'বনান্তিকা' ..... প্রথম আবাসিকা নিয়ালির আম্মা নুরজাহান বেওয়া..... এগিয়ে যেতে থাকল  শাহজাহান আর সমর্পণের বন্ধুত্বের বয়স। দুজনের চোখেই এখন বয়সী চশমা।

          দুর্ভাগ্যক্রমে অল্পদিন আগে শাহজাহান তার প্রাণপ্রিয়া বনান্তিকাকে হারিয়েছে এক ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনায়। সেই থেকেই শাহজাহানের মধ্যে মানসিক ভারসাম্য হারানোর প্রবনতা দেখা দিয়েছে। হঠাৎ কাঁদে...হঠাৎ হাসে।

        শাহজাহানের তিন ছেলে বড়ো তো হলো কিন্তু মানুষ হলো না। বাড়ি - জমি - জায়গা নিয়ে তিন ভাইয়ের চরম বিবাদ.... ছেলেদের অন্যায় দাবি, জোরজুলুম, অত্যাচার... মারধোর....  কিছুই বাদ গেল না শাহজাহানের উপর দিয়ে । বন্ধু সমর্পণের চেষ্টায় ছেলেদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ওরই নিজহাতে গড়া বৃদ্ধাশ্রম, ' বনান্তিকা'য় শাহজাহানের ঠাঁই হলো........।"

         আজ রবীন্দ্র ভবনের স্টেজে শ্রোতা-দর্শকে ঠাসা হলে নিজের সদ্য লেখা গল্প, "শেষবেলার শাহজাহান" বিখ্যাত কথাশিল্পী মহারণ্য বসু যার ছদ্মনাম সমর্পণ 
স্ব-কন্ঠে গল্প পাঠ শেষ করতেই তুমুল করতালিমুখর হয়ে উঠল। 

          মহারণ্য বসু দৃপ্তকন্ঠে  শেষে বলল," যার জীবনের গল্প আপনাদের পড়ে শোনালাম সে আর কেউ নয়, আমারই বাল্যবন্ধু শাহজাহান। ওই যে হুইল চেয়ারে বসে আছে। " বলেই স্টেজের পুর্ব কোণ দেখিয়ে দিল।

          ভাগ্যক্রমে আজ রাজ্যের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী তার অফিসারদের নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে হাজির ছিলেন। তিনি সটান স্টেজে উঠে এলেন। শাহজাহানের হাত ধরে সহমর্মিতা প্রকাশ করে হঠাৎ এক প্রস্তাব দিলেন," আপনি অনুমতি দিলে ও রাজি থাকলে " বনান্তিকা "কে রাজ্যসরকার অধিগ্রহণ করবে। বৃদ্ধাশ্রমের নাম অবশ্যই অপরিবর্তিত থাকবে আর আপনি আমরণ সম্মানীয় আবাসিক হয়েই থাকবেন। "

            আনন্দের অশ্রুজল শাহজাহানের দু'চোখ গড়িয়ে পড়ল। আশ্চর্যজনকভাবে ঠিক সেই মুহুর্তে শাহজাহানের তিন ছেলে যারা লুকিয়ে আব্বার নামের অনুষ্ঠান দেখতে এসেছিল গুটিগুটি পায়ে স্টেজে উঠে এসে আব্বার পা জড়িয়ে ক্ষমা চাইল।


Thursday, January 4, 2024

একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট -- সঞ্জিত কুমার মন্ডল

 একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট
    সঞ্জিত কুমার মন্ডল
         ০৩/০১/২৪
         
        বহু বছর পরে আমাদের গ্রামে কালীপদ যুব সংঘ একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছে শীতকালেই। ১৫ দিন আগে থেকেই মাঠ পরিষ্কার,রোলার মেশিন দিয়ে সমান করার কাজ চলছে। গ্রামের লোক তাই দেখতে ভিড় করছে। গুঞ্জন উঠছে কালিপদ যুব সংঘ এত টাকা কোথা থেকে পাচ্ছে! অর্থের উৎস সবার জানা হয়ে গেল। বাঁশ দিয়ে তৈরি মাঠের চারিদিকে আটটি বিশাল বাতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে। মাঠের চারিদিকে বিশাল বিশাল হোডিং পোস্টার তাতে লেখা আছে "ফুটবল কাপ-২০২৪, নববর্ষে নব আনন্দে জাগো"। খেলা ৩১শে ডিসেম্বর বিকাল থেকে । ডে নাইট খেলা। ৮ দলের টুর্নামেন্ট। প্রায় ছ'টা জেলা থেকে টিম আসছে। প্রত্যেক টিমে বিদেশি প্লেয়াররা আছে যেমন নাইজেরিয়ানরা আছে। পুরস্কার হিসেবে ফাইনালের বিজয়ী দল দেড় লাখ টাকা পুরস্কার পাবে। রানার্স টিম পাবে এক লাখ টাকা। কোয়ার্টার লেভেলে,সেমিফাইনালে এবং ম্যান অফ দ্যা ম্যাচের পুরস্কার আছে। বিশাল বড় স্টেজ। আধুনিক লাইটের ব্যবস্থা। জমজমাটি খেলা। প্রথমে ভেবেছিলাম টিকিট কেটে খেলা দেখতে হবে। তারপর শুনলাম বিনা পয়সায়। বিনা পয়সায় এত বড় খেলা দেখা সুবর্ণ সুযোগ। 
         ৩০ শে ডিসেম্বর থেকেই শুরু হয়ে গেল বক্স বাজানো। সন্ধ্যা থেকেই লাইট পরীক্ষা করা। চারিদিকে আলোয় আলো ঝলমল করে উঠলো আমাদের গ্রাম। খেলার লাইভ ভিডিও দেখানো চলবে,বেশ কিছু পর্দা মাঠ থেকেও অনেক দূরে টানানো আছে। পরদিন গ্রামের লোকেরা দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরেই মাঠের কাছাকাছি জায়গায় যে যার আসন নিয়ে বসে পড়েছে। এখনো দু-তিন ঘন্টা বাকি খেলা শুরু হতে। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ করা হয়েছে। মাইকে শুভ নববর্ষের আগাম শুভেচ্ছা জানানো হচ্ছে। প্রতিটা কথা প্রসঙ্গে ভেসে আসছে "নব আনন্দে জাগো।"বাইরে থেকে ঘোষক,ঘোষিকাদের আনা হয়েছে। তারা তাদের কাজ করে চলেছে। মানুষ উদ্দীপ্ত হয়ে পড়ছে। ছাপানো খেলার চার্ট মাঠের চারিদিকে জনগণকে বিতরণ করা হচ্ছে। সূর্যের আরামদায়ক তাপ গায়ে মেখে প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনায় মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। জমজমাটী উদ্বোধনী নাচ গান শুরু হলো। গ্রামের মানুষ অবাক হয়ে দেখল।আনন্দ করতে লাগলো। স্টেজে টেবিলের উপর বিশাল বিশাল ট্রফি, মেডেল সাজানো আছে। বিশিষ্ট ব্যক্তি অতিথিদের স্মারক ও পুষ্প দিয়ে বরণ করা হচ্ছে। হালকা বক্তৃতার পরেই মাঠে নেমে গেল ঝকঝকে জার্সি পরা দুটি টিম। বাঁকুড়া জেলা ও নদীয়া জেলার দুটি টিম। খেলার একটু বাদেই বাঁকুড়া জেলা নদীয়া জেলাকে একটা গোল দিয়ে দিল। দুটো টিমই সুন্দর ছকে খেলছে। দ্বিতীয় অর্ধে নদীয়া গোল শোধ করলো। খেলা উত্তেজনাকর হয়ে উঠলো। অবশেষে গোল শূন্য ট্রাইবেকার। তারপর টসে হেরে গিয়ে বাঁকুড়া পুরস্কার নিয়ে বিদায় নিল।

          দ্বিতীয় খেলা শুরু হতে দেরি হচ্ছিল ঘোষক ঘোষিকাদের বলার ভাষা শেষ হয়ে যাচ্ছিল। জনগণ "নব আনন্দ জাগো" এই কথা শুনে শুনে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিল। এক্ষুনি শুরু হবে দ্বিতীয় খেলা সঙ্গে সঙ্গে জনগণের কলরব শোনা গেল। কারণ জনগণ ইতিমধ্যে জেনে গেছে দ্বিতীয় খেলার একটি টিম এখনও এসে পৌঁছায়নি। প্রত্যেক টিমকে টাইম দেওয়া আছে। সেই টাইমেই তাদের খেলতে হবে। এখানে ওয়াকওভার দেওয়ার নিয়ম নেই। এক ঘন্টা থেকে দু ঘন্টা দেরি দেখে জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিল। "নব আনন্দে জাগো" এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে জনগণ ভেংচি কেটে জোর চিৎকার করে উঠছে। ঘোষক ঘোষিকারা আর পেরে উঠছে না। ক্লাবের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া সত্বেও বাঁধভাঙা জলের মতো জনগণ মাঠে নেমে পড়লো। চারিদিকে ভাঙচুর শুরু করে দিল। রাতের ঝলমলে আলোয় সারা মাঠে জনগণ হইহুল্লোড় করতে লাগলো। স্টেজকে লক্ষ্য করে বোতল ছোড়াছুড়ি শুরু হল। সিভিক পুলিশ অল্প কিছু ছিল কিন্তু তারা মার খেয়ে গা ঢাকা দিল। তারপর পুলিশের গাড়ি। আচমকা পুলিশের লাঠিচার্জ। মাঠ ফাঁকা হল। দর্শকও  শূন্য হলো। তারপর কয়েকটা গাড়ি ঢোকার শব্দ। 

                                 (সমাপ্ত)                        

Sunday, August 6, 2023

খড়কুটো -- বিজয়া মিশ্র

 খড়কুটো
বিজয়া মিশ্র
২৮.০৭.২০২৩
এবার সত্যিই ছেড়ে চলে যেতে হবে চিরদিনের জন্য,এই নিজের হাতে একটু একটু করে গড়া সংসার। অসহায় না হলেও অধিকার তো আছেই।চঞ্চলকে অকালে হারিয়ে নিঃসন্তান মনিদীপা অকূলপাথারে। চঞ্চলের মৃত্যুর পর পরিবারের কারো সাপোর্ট পায়নি সে। না চাইতেই অবাঞ্ছিত আইনি লড়াইয়ে নেমেছিল সে।কিছু কাগজপত্র খুঁজে না পাওয়ায় জমা দিতে  পারেনি সময়মতো।অথচ সে মোটেই অগোছালো নয়।ভুল করে হয়তো কোথাও...। হাল ছেড়ে দিয়েছে।ওরা তার কথা না ভাবলেও মনিদীপা কতভাবে পাশে থেকেছে চিরকাল।অথচ চঞ্চলের অকালে চলে যাওয়ার দায় তার ঘাড়েই...।এখন এই ঘরগুলো খালি ক'রে অতি প্রয়োজনীয় বইপত্র রেখে বাকিগুলো কাগজ ওয়ালার হাতে তুলে দেবে সে।পুরোনো কাগজপাতি,বইপত্রে ঠাসা চিলেকোঠার ঘরে প্রতি রবিবার মণিদীপার অনেকটা সময় কাটে।অফিস ছুটি ,এই দিন সকাল সকাল রান্নার পাঠ চুকিয়ে তিনি চলে যান তেতালার অতিপ্রিয় 
চিলেকোঠায়।চাল ,গম ,জল খেতে পেয়ে একঝাঁক বিভিন্ন  রঙের পায়রা চিলেকোঠা সংলগ্ন ছাদটাকে মুখরিত করে সকাল সন্ধ্যে। অনেকেই মণিদীপার সাড়া পেলে আহ্লাদিত হয়।ধারে কাছে এমনকী হাতের উপর বসে কত কথা বলে।সেইমতো আজ পুরানো কাগজ ,বইপত্র কাগজওয়ালাকে কেজি দরে বিক্রি করে দিচ্ছিল। দাঁড়িপাল্লা থেকে বইগুলো বস্তায় ঢোকানোর সময় কিছু একটা মাটিতে পড়ে যেতেই মনিদিপা চমকে উঠলো।সেই হলুদ খামটা!তন্ন তন্ন ক'রে কতবার যে...। ওই খামেই তো দরকারি কাগজপত্র সঙ্গে লেখা শেষ চিঠিটাও আছে।মামলা মোকদ্দমা , সম্পত্তির ভাগাভাগি হওয়ার সময় খুব দরকারে কিছুতেই পাওয়া যায়নি। এখনও রায় বেরোনো বাকি। কখন যে বইয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছিল পরে কিছুতেই মনে পড়ে নি। সবকিছু এলোমেলো লাগছে তার।মাঝপথে কাগজ ওয়ালাকে বিদায় দিয়ে মণিদীপা দাঁড়লো চঞ্চলের সদাহাস্য ছবির সামনে।অস্ফুটে বলল "হয়তো তুমি চাওনি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাই।তোমার চিহ্নগুলো হারিয়ে চিরততে বঞ্চিত হোক তোমার অধিকার ।" সব হারানোর দিনে সহসা ফিরে পাওয়া এই সম্পদ তাকে শক্তি দিচ্ছে অনেকটা।একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে উকিলবাবুর নম্বর ডায়াল করতেই ওপাশ থেকে উত্তর এলো "হ্যালো...।"

Tuesday, July 25, 2023

ভাবনার ভরাডুবি -- গৌতম তরফদার

 ভাবনার ভরাডুবি 
গৌতম তরফদার
 ২২.০৭.২০২৩
          চড়া রোদ্দুর উপেক্ষা করে হন্ হন্ করে হেঁটে চলেছে ঝল্লিকা দত্ত ঘর্মাক্ত শরীরে। মাথায় আগুন জ্বলছে। তিয়াস বিশ্বাসের সাথে তার বছর দুয়েকের সম্পর্ক। নিজের পরিবার, সমাজ...  সবকিছুকে একইরকম অপেক্ষা করেই দক্ষিণ কোলকাতায় একটা ফ্লাট ভাড়া করে 'লিভ টুগেদার' এর তকমা নিয়ে একত্রে আছে। যদিও দু'জনে আলাদা-আলাদা ঘরেই থাকে। দু'জনেই দুই বেসরকারি সংস্থায় কাজ করে। বিয়ে-থা করার কথা তিয়াস বললেও ঝল্লিকা ঝামেলা ভেবেই বারবার এড়িয়ে গেছে।
গত কয়েকদিন ধরেই দু'জনের মধ্যে মন-কষাকষি, ঝগড়াঝাঁটি অব্যাহত। কোরেলি কর্মকার নামে এক নতুন কর্মচারী তিয়াসের অফিসে জয়েন করেছে। অশান্তি তাকে ঘিরেই।
[  ] ঝল্লিকার কানেকানে কেউ বলেছে যে তিয়াস আর কোরেলিকে মাঝেই মাঝেই অফিস ক্যান্টিনে একসাথে দেখা যাচ্ছে। ব্যস্, ওতেই জ্বলেছে ঝল্লিকা। আগুপিছু খোঁজ নেবার প্রয়োজন মনে করেনি ঝল্লিকা। ঝাঁপিয়ে পড়েছে তিয়াসের উপর। 

            গত যৌথ আক্রমণে কেঁদে ফেলল ঝল্লিকা।  ঘরে ফেরেনি তিয়াস। ফোন বন্ধ। সারারাত ছটফট করেছে ঝল্লিকা। ওর অফিস খুলতেই ছুটে গেছে। তিয়াস অফিসে নেই। ১০ দিনের ছুটি নিয়েছে। কোথায় গেছে কেউ জানে না। খোঁজ নিয়ে জানল গত দু'দিন ধরে কোরেলিও অফিস আসছে না।

            এবার সত্যই ভয় পেল ঝল্লিকা।  তাহলে কী তিয়াস কোরেলির সাথেই.....। আপন অনুভূতি ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিল তিয়াসকে সে কতটা ভালোবাসে!

            তিনদিনের মাথায়, বলা নেই - কওয়া নেই, তিয়াসের আর ঝল্লিকার মা-বাবা একযোগে ওদের ফ্লাটে এসে হাজির। ঝিল্লিকা অবাক! তিয়াসের উদ্যোগে আজ ওদের রেজিস্ট্রি বিয়ে। সকাল এগারোটায় ম্যারেজ রেজিস্টার ফ্লাটেই আসবেন। তিয়াস চটজলদি আয়োজনে ব্যস্ত। আর অন্যদিকে দু'জনের অফিসের কয়েকজন কাছের সহকর্মীগণকে
পূর্ব নির্ধারিত হোটেলে হাজির করানোর দায়িত্ব 
তিয়াসের সেই দূর সম্পর্কের বোন কোরেলির উপরই। তিয়াসের চেষ্টাচরিত্রেই ওখানে ওর চাকরি।

           ঝল্লিকা থ। একদিকে তিয়াসের ভালোবাসা, অন্যদিকে সন্দেহের বোকামি.....  এই যৌথ আক্রমণে কেঁদে ফেলল ঝল্লিকা।
 

Friday, July 21, 2023

পাহাড়ি সৌন্দর্যের টানে -- বিজয়া মিশ্র

 পাহাড়ি সৌন্দর্যের টানে
 বিজয়া মিশ্র
১৫.০৭.২০২৩
হাড়কাঁপানো শীতে কাঁপতে কাঁপতে কম্বলের তলা থেকে বেরিয়ে ভোর চারটের আগেই ভাড়া গাড়িতে উঠে বসলাম সপরিবারে।গন্তব্য টাইগার হিল।গত দুদিন অনেক চেষ্টা করেও কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মেলেনি। রিসর্ট থেকে বেরোনোর আগেই গরম চা সার্ভ করেছে হোটেল।তাতে কী, মনে হচ্ছে সবসময় এক কাপ হলে ভালো হয়। গাড়ি সামান্য এগিয়েই দাঁড়াচ্ছে কেন জানতে চাইলে ড্রাইভার জানালো রাস্তা জ্যাম। আধঘন্টার রাস্তা প্রায় দেড়ঘন্টা লাগলো। অবশেষে গন্তব্যস্থলের কিছুটা আগেই নেমে হেঁটে যেতে বললেন ড্রাইভার।অগত্যা চড়াই পথে এগোতেই হল। গতরাতে একই হোটেলে কলকাতার অন্য একটি পরিবারের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল।ওনারাও আজ একই পথের যাত্রী।বহুকষ্টে স্পটে পৌঁছে দেখি লোকে লোকারণ্য।সূর্যোদয় কোথায়! দিগন্তরেখা মেঘে ঢাকা। দু একবার লালচে আভা দেখে সবাই উল্লসিত কেউ কেউ বলল "ওই তো কাঞ্চনজঙ্ঘা।"ঘন মেঘের মধ্যে আড়মোড়া ভেঙে একচিলতে কাঞ্চনজঙ্ঘা উঁকি দিচ্ছে সত্যিই।ক্রমশ বেলা বাড়তেই হতাশ দর্শকেরা পিছু হটলো।সূর্য চকচকে চোখে হাসছে,কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘা লুকোচুরি খেলতে খেলতে ঘুমিয়ে পড়ল একসময়।আমরা ফেরার পথ ধরলাম পাহাড়ের আঁকা বাঁকা ঘিঞ্জি পথে।ফেরার পথে বিভিন্ন মনেষ্ট্রিতে কাটালাম কিছুটা সময়।অবশেষে বাতাসিয়া লুপ। এখান থেকে সুদূরের দৃশ্য দেখার জন্য দূরবীক্ষণের ব্যবস্থা প্রচুর। বাচ্চারা বেশ আনন্দ পেল।সেইসঙ্গে টয় ট্রেনের ধীরলয়ে চলা ভারি সুন্দর।
সারা সকাল খুব আনন্দে কাটিয়ে আমরা ছুটলাম ম্যালে।সহসা বৃষ্টি এলো। অনেক দূরের পাহাড়গুলোও লুকিয়ে গেছে মেঘের আড়ালে। একটু মেঘ সরলেই পাহাড়ের সারিবদ্ধ আহ্বান ভারি মনোরম।পরেরদিনই ফেরার গাড়ী।রাতেই খবর পেলাম বৃষ্টিতে ধস নেমেছে পাহাড়ে। সকাল সাড়ে পাঁচটায় আমাদের গাড়ি আসবে রিসর্টের গেটে। সেইমতো প্রস্তুতি নিয়ে সাতপাঁচ না ভেবেই বেরোতে হল।যদি যাওয়া না যায় হোটেলেই ফিরবো আবার সেইমতো কথা হল। ঘুম স্টেশন পৌঁছেই চায়ের জন্য দাঁড়ালাম।আজ ঝকঝকে আকাশ । চায়ের অর্ডার দিয়েই আমরা হতবাক।এ কী দেখছি! কাঞ্চনজঙ্ঘা! অপরূপা সুন্দরী রূপোলী মুকুটে সুশোভিতা,হাসিতে মুক্তো ঝরিয়ে হাতছানি দিয়ে এভাবেই বুঝি পাগল করে অনাদি অনন্তকাল ধ'রে মুগ্ধ ,সৌন্দর্যপিয়াসী মানুষকে। অনেক ভালোলাগা,অনেকটা তৃপ্তি সঙ্গে নিয়ে ফিরেছি আমরা। আনন্দের আবহে ভুলেই গিয়েছিলাম পাহাড়ের ধসের খবরটা। ফেরার পথের দুদিকে তখন সোনালী রোদে ঝিকমিক করা পাড়াড়ের সারি, পাহাড়ি ঝর্ণার নেমে আসার মধুর ধ্বণিতে আপ্লুত হয়ে দেখছিলাম সকলে। আমাদের ড্রাইভার কত নামও বলছিল । পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে ঘন বনের ছায়ায় নাম না জানা পাখিরা তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছিল।ওই সময়ের মধ্যেই সুরক্ষাবাহিনী অবশ্য গাড়ি যাতায়াতের রাস্তা কিছুটা পরিস্কার করে দুশ্চিন্তা দূর ক'রে দিয়েছিল। নিরাপদে পৌঁছে আমাদের স্মৃতিরোমন্থনে আচমকা ধাক্কা। মিডিয়ার দৌলতে  সমস্ত ভালোলাগার আবেশে নিমেষে হোঁচট খেল। আমাদের সঙ্গে যে পরিবারটির রিসর্টে আলাপ হয়েছিল ,যাঁরা টাইগার হিলে ওঠার দুরূহ কষ্টে  বেশ কিছুক্ষণ আমাদের সঙ্গী ছিলেন তাঁরা আজ টয় ট্রেনে ভ্রমনকালে পরিবারের কর্তা শোভনবাবু টয়ট্রেনের গেটে হাত ছেড়ে দাঁড়িয়েছিলেন ।  বাতাসিয়া লুপে বাঁক নিচ্ছিল টয়ট্রেন।তখনই আচমকা পড়ে গিয়েছেন তিনি।মাথায় মারাত্মক চোট পেয়ে কোমায় চলে গেছেন। ওখানেই আপাতত চিকিৎসা চলছে প্লেনে কলকাতায় আনার চেষ্টা চলছে।অত্যাধিক রক্তক্ষরণের জন্য চিকিৎসকেরা কোন আশা দিতে পারছেন না। এমন অভাবনীয় একটা খবরে আমরা সকলেই অপ্রস্তুত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়।চোখের সামনে আনন্দে ঝলমল করা বাতাসিয়া লুপের ছবি ভেসে উঠছে সঙ্গে বুকের ভিতর দলা পাকানো একটা যন্ত্রনা...।

Thursday, June 15, 2023

এবং রূপকথা -- সিরাজুল ইসলাম ঢালী

এবং রূপকথা 
           --- সিরাজুল ইসলাম ঢালী
তারিখ : ১১.০৬.২৩
           হীরের টুকরো ছেলে ! ডাক নাম হীরে । ভালো নাম পলাশ পাল চৌধুরী ।  মিষ্টার এবং মিসেস্ পাল চৌধুরীর একমাত্র ছেলে । এ বছরে পঞ্চম শ্রেণিতে উঠল । পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র । পড়াশুনা আর হাজার রঙিন স্বপ্নের মাঝে হীরের এক বিশাল ঘটনা ঘটে গেল । পূজার ছুটিতে হীরে বাড়িতেই ছিল । বাড়ি বসিরহাট । তখন গোধূলি বেলা, রবিবার । বাড়ি থেকে তিরিশ চল্লিশ মিটার দূরে একটা সবেদা গাছ । গাছটায় উঠে খেলাচ্ছলে গান করতে করতেই ডালপালার উপরে হীরে শুয়ে পড়েছে । কখন চোখে নিদ্রা এসে পড়েছিল, তাও তার অজানা । তারপরে ? হঠাৎ এক শ্বেতশুভ্র ছোট্ট পাখি হীরের কাছে উড়ে এসে বসল । ডানায় লেখা, এসো আমার ডানার উপরে বসো । ঘুম চোখে হীরে বসেই পড়ল । তৎক্ষণাৎ পাখি উড়ে চলতে শুরু করল । সন্ধ্যা হয়ে গেল । কোথাও হীরেকে পাওয়া যাচ্ছে না । বাবা মা আত্মীয় স্বজন সবাই কান্নাকাটি শুরু করল । এক দিকে খোঁজাখুঁজি চলছে, অন্য দিকে একদল মানুষ থানার দিকে ছুটল...। 
            হীরে আর পাখি হাজার কোটি মাইল উড়ে চলল । তার পরে মনোরম ভূস্বর্গে হীরে এসে নামতেই দেবদেবীরা ছুটে এলেন । সবাই মিলে হীরেকে রাজমুকুট পরিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা রূপে স্বীকার করে নিলেন । রাজাধিরাজ হীরে বিয়ে করে রাজরানী এবং পরে রাজপুত্র সহ রাজকন্যা লাভ করলেন । রাজপ্রাসাদে কোনো  অভাব নেই, শুধুই আনন্দ আর আনন্দ । রাজভোগ থেকে নাচ গান অঢেল ! ভালোবাসার শেষ নেই ! রাজাধিরাজ হীরে ভালোবেসেই হাজার হাজার দেশ জয় করলেন । ভালোবেসেই কোটি কোটি হৃদয় ও প্রকৃতি জয় করে ধনধান‍্যেপুষ্পে আর অর্থের প্রাচুর্যে তিনি রাজত্ব করতে লাগলেন । স্বর্গ মর্ত‍্য পাতাল ধন‍্য, ধন‍্য সমস্ত প্রজাবর্গ ।           
             অবশেষে রাত্রি বেলা পুলিশ সহ সবাই আলো নিয়ে জোরদার অনুসন্ধান শুরু করলেন । মায়ের চোখের জলে সব ভিজে গেল । মা যখন কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে ডেকে উঠলেন,
... কোথায় ? কোথায় আমার হীরের টুকরো, হীরে...? মায়ের গলার শব্দে হীরের ঘুম ভেঙ্গে গেল, তখন গাছ থেকে নেমে হীরে সোজা ছুটে গিয়ে মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল । শেষ হল স্বপ্ন, শুরু হল বাস্তব... ।

Tuesday, May 16, 2023

নারী হতে সাবধান -- মৃনাল কান্তি রায়


নারী হতে সাবধান
মৃণাল কান্তি রায় 
অজ পাড়াগাঁয়ের মেয়ে ঘূর্ণি। পাড়াময় ঘুরে বেড়ালোই যার কাজ।এ গাছে সে গাছে চড়া আর ফলগাছের ফল পাড়া যার নিত্য দিনের কাজ। এ ছাড়াও বর্শী নিয়ে এ পুকুর ও দীঘি আর এ খাল সে খালে মাছ ধরা- যাও তার সখ তালিকায়। কখন যে সে তরুনী থেকে যুবতী হয়েছে তা সে নিজেও বুঝতে পারেনি। মায়ের শত বকা- ঝকাকে উপেক্ষা করে সে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায়। এজন্য গ্রামের সবাই তাকে নাম দিয়েছে ঘূর্ণি। উঠতি বয়সি ছেলে ছোকরারা তার ঐশরিয়ার মত রূপ দেখে প্রেমে পাগলপারা হয়ে ভাব জমানোর জন্য কাছে ঘেঁষতে চায় কিন্তু ঘূর্ণি কাউকেই পাত্তা দেয় না একদম। কেবল সে ছেলে ছোকরাদের মধ্যে স্বর্ণকে মন থেকে পছন্দ করে।পছন্দ করার কারণ হোলো স্বর্ণ দেখতে ঠিক সোনার রঙের গৌড় বর্ণীয়। পছন্দ করার অপর কারণ হোলো স্বর্ণের একটি মাত্র স্লোগান 'নারী হইতে সাবধান' নয়তো কেড়ে নেবে জান'। 
একদিন স্বর্ণ গ্রামের এক পুকুরে সাঁতার কাটছে। বেশি গরম পড়েছে ঠিক তাই। সেই পথ ধরে ধেই ধেই করে যাচ্ছিল ঘূর্ণি। সে দেখতে পেল পুকুরে সাঁতার কাটছে স্বর্ণ যাকে সে মন থেকে পছন্দ করে কিন্তু স্বর্ণ পাত্তা দেয়না তাকে। সে এও জানে নারী বিশেষ করে যুবতী নারী তার চোখের শুল।কারণ তার এই ধারণা যে সব স্লিম ছেলেরা কোন যুবতী নারীকে বিয়ে করে পরবর্তীতে তারাই স্লিমত্ব হারায়। আর সে কারণেই ঘূর্ণির বদ্ধমূল ধারণা স্বর্ণ ছাড়া সাত গ্রামে আর ভাল ছেলে নেই। তার মানে স্বর্ণ নিখাদ ছেলে এবং সে শুধু তার সাথেই ভাব করবে এবং জীবনসঙ্গী করে চিরকাল নিখাদ জনকে পাশে রাখবে। পুকুরে সে স্বর্ণকে একের পর এক আড়াল থেকে ঢিল ছুঁড়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছে-ই! স্বর্ণের চারপাশে বৃষ্টির মত ঢিল পড়ছে আর এতে করে স্বর্ণ প্রথমে ভাবছে বৃষ্টি হচ্ছে- যার জল পুকুর থেকে ছিটকে তার গায়ে পড়ছে। তার এ ভাবা যে ভুল তা সে নিমিষেই বুঝতে পারল।কারণ সে দেখতে পেয়েছে ঘূর্ণির ঢিল ছোঁড়ার দৃশ্য। এ জন্য সে পুকুর থেকেই বলে উঠল," নারী থেকে সাবধান। নারী জ্বালাময়ী ভীষণ যন্ত্রণা আর পীড়াদায়ক। ভাইসব কেউ কোন নারীর ধারে কাছেও ঘেঁষবেন না।ঘেষলেই স্লিমত্ব আর ধরে রাখতে পারবেন না ইত্যাদি ইত্যাদি! " সে যতই এমন সব কথা বলছে আর যে জন্য বলছে ফল দাঁড়াচ্ছে ঠিক উল্টোটা। একক প্রেমের প্রেম নদী কানায় কানায় যেন পূর্ণ হচ্ছে।কারণ ভাল মেয়েরা কখনো তাদের মনের জনের বাইরে আর কাউকেই সহ্য করতে পারেনা। এদিক থেকে স্বর্ণই যে পারফেক্ট হবে এ ঘূর্ণি বুঝে নিয়েছে। তাই বলছে," সজনেটায় একবার ফিরেও তাকাচ্ছে না! " গাছপালাকে উদ্দেশ্য করে বলছে," তোমরাই বল,আমি কি দেখতে কম সুন্দর নাকি। তোমরা যদি প্রকৃতি হও তবে আমিওতো প্রকৃতি,তাইনা? " গাছপালা যেন সায় দিয়ে বলে চলছে," ঘূর্ণি!  তুমি পিছু ছেড়োনা। একদিন না একদিন তুমি মনের মানুষকে পাশে পাবে।নিরাশ হয়োনা কেমন?" এরপর ঘূর্ণি বলছে," আমার নামও ঘূর্ণি!  ঘূর্ণির মত ঘুরাব যদ্দিন আমার কথায় সায় না পাব। দেখি কে তাতে বাগড়া দিতে আসে। তাকে ঠিকই আমি দেখে নেব। " এই শুনে স্বর্ণ বলছে," যা যা যেদিকে যাবি সেদিকে যা! আমার পিছু লাগা কেন হ্যা!" এবারে ঘূর্ণি বলছে," কেন যে ঘুরঘুর করছি তা বুঝতে হোলে আলাদা একটা মন থাকা চাই-যা তোর নেই! আর মেয়েদের কথা বলছিস? আরে আমি কি আর পাঁচটা মেয়ের মত এই ভাবিস।না রে না আমি তেমন মেয়ে নইরে!  আরে কার কাছে কি বলছি! তোরতো আবার স্লোগান নারী হইতে সাবধান! তা তুই নারীর মর্ম কি বুঝবি রে বুদ্দু!  একবার মেনেই নে দেখবি অনেক মজা অনেক আনন্দ!" এই শুনে স্বর্ণ বলছে," ওওও এই কথা!  আমার স্লিমত্ব নষ্ট হোক এই তুই চাস। আরে তুই কি করে বন্ধু হবি,তুইতো দেখছি পাক্কা শত্রু! " এবারে ঘূর্ণি তার ওড়নার একধার দুলিয়ে দুলিয়ে চলে যাচ্ছে আর বলছে," টাটকা আছিরে বুদ্দু! তুই ছাড়া এ মনে আর কারোর স্থান নাই! তোকে আমার চাই-ই চাই! আজ চলে যাচ্ছি তবে পিছু ছাড়ছি না। "ঘূর্ণি স্বর্ণের চোখের অদৃশ্য হোলে স্বর্ণ পুকুর থেকে উঠে তার বাড়ি চলে গেল। 
এর কিছুদিন পরে একটি মাটির কলসি কাঁখে নিয়ে কোমড় দুলিয়ে দুলিয়ে ঘূর্ণি যাচ্ছে ওই দূরে পদ্ম পাতার দীঘিতে জল নিয়ে আসতে। সে ঘাট থেকে জল ভরে বাড়ির দিকে ফিরছিল।হঠাৎ সে দেখতে পেল বিপরীত দিক থেকে আসছে তার পছন্দের স্বর্ণ। এবারে সে ভান ধরল। মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছে আর কলসির জল মাটি ভিজিয়ে দিয়েছে। তার মাঝে বেহুশ অবস্থায় ঘূর্ণি!  এবারে প্রথমত অতস্তত করে বলছে," মানুষের উপকার করা মানুষের ধর্ম কিন্তু আমার স্লোগান নারী হইতে সাবধান তার কি হবে। এত করে ডাকছি,সারা দিচ্ছেনা। কেউ যদি দেখে ফেলে তখন কি হবে। পাছে যদি মরে গিয়ে থাকে তবে তো জ্যান্ত না মৃত ঘূর্ণি আমায় জেলের ভাত খাওয়াবে।আর জেলখানায় শুনেছি পঁচা আর বাশি খাবার খেতে হয়! বিবেক! আমি এখন কী করতে পারি?" বিবেক ধমকিয়ে উঠে বলল," তুই এখনো কোলে তুলে নিসনি! আরে তুই কী পুরুষ?  এত্তসব আজেবাজে চিন্তা করে চলেছিস। নে শিগ্গির কোলে তুলে নে! ঘূর্ণিকে ওর বাড়িতে সসম্মানে পৌঁছে দিয়ে আয়!" এবারে স্বর্ণ বলছে," আরে যাচ্ছি যাচ্ছি মারী হইতে সাবধান আর বিপদে পড়লে উপকারী হয়ে সমাধান!" এই বলে স্বর্ণ ঘূর্ণিকে পাজা কোলে তুলে নিয়ে ঘূর্ণিদের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে হঠাৎ ঘূর্ণি একলাফে নিচে নেমে বলছে," কি! কিছু মজা পেলে? আমিতো বেশ পেলুম!" এবারে স্বর্ণ রাগে কটমট করে বলল," হতচ্ছাড়ি পাজি কোথা কার!  ফের তুই মরে গেলেও তোর কাছে ঘেষব না! আমার স্লিমত্ব নষ্ট করে দিতে চাস! তুই মানুষ না।আস্ত একটা জন্তু জানোয়ার! আমার এখন শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে আর উনি দাঁত বের করে হাহা হিহি করছে! " এবারে ঘূর্ণি নিজের দু'কান নিজেই মলে মলে বলছে," রাগ করিসনা।আর এমনটি কখখনো হবেনা রে! তুই মন খারাপ করিসনা!" এই বলে ঘূর্ণি তাদের বাড়িতে আর স্বর্ণ তাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। 

এর কিছুদিন বাদে ঘূর্ণি আবার পদ্মপাতার দীঘিতে জল আনতে গেল। মায়ের বকুনি খেয়ে তার জল আনতে যাওয়া কিন্তু তার শরীরটা এদিন একদম ভালো যাচ্ছিল না। তাই জল নিয়ে ফেরার পথে কাঁখের কলসি কাঁখ থেকে রাস্তার মাঝে পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল এবং কলসি ভাঙার ওপরে ঘূর্ণি ঘুল্লা খেয়ে পড়ে গেল।আর তাতে করে মাথাটা কিঞ্চিৎ কেটে গেল! রক্ত কপালে টিপের ন্যায় জমাট বেঁধে আছে। পুরোপুরি অচৈতন্য সে। এদিনও স্বর্ণ একই পথে আসছিল এবং ঘূর্ণিকে ওইভাবে পড়ে থাকতে দেখে বলল," ফের ভেলকি! আবার লাল টিপ দিয়েছে কপালে! কি সখ রে বাপু! আজ কি আর ভুল করি! পড়ে থাক আজন্মকাল তাও আমি তোকে স্পর্শ করছি না। নারী হইতে সাবধান!" এই বলে স্বর্ণ হন হন করে সেখান থেকে চলে গেল।এবারে ওই পথেই এক বুড়ো ভদ্রলোক আর তার ছেলে- যে কিনা ঘূর্ণিকে পছন্দ করে কিন্তু ঘূর্ণি যাকে পাত্তা দেয় না তারা ঘূর্ণিকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে তড়িৎ তাকে তুলে নিয়ে নিকটস্থ একটি ক্লিনিকে নিয়ে গেল। ক্লিনিক কর্মকর্তা ঘূর্ণির মাথায় ব্যাণ্ডেজ করে দিয়ে বললেন," চিন্তার কোন কারণ নেই।এক সপ্তাহের মধ্যেই ঘূর্ণি ভালো হয়ে উঠবে।" ভদ্রলোক ঘূর্ণিকে তাদের বাড়ি পৌঁছে দিলেন। 
এর ক'দিন পরে স্বর্ণি পাশের একটি টিস্টলে বসে দুধ ছাড়া রঙ চা পান করছিল।এমন সময় দোকানীর কাছে জানতে পেল ঘূর্ণির মাথা কেটে গেছে।কেউ একজন তাকে চিকিৎসা করিয়ে তার বাড়ি তাকে পৌঁছে দিয়ে এসেছে।এই শুনে স্বর্ণের মনে ভাবনার উদ্রেক হোলো। সে ভাবলো মস্ত বড় অন্যায় সে করেছে।পীড়িতকে সেবাদান মানবধর্মে পড়ে- যা সে না করে পুরোপুরি পীড়িতকে ইগনোর করে গেছে- যাতে করে তার পাপ হয়েছে। তাই সে দ্রুত ঘূর্ণির বাড়ির দিকে ছুটতে ছুটতে একসময় পৌঁছে গেল গন্তব্যে। গিয়ে দেখল চঞ্চলা ঘূর্ণি আনমনা হয়ে বসে আছে।এবারে স্বর্ণ ঘূর্ণির হাতদুটো আপন ক্রোড়ে নিয়ে বলল," ঘূর্ণি!  তুই আমাকে মাফ করে দে।আমি মস্ত একটা অপরাধ করেছি।ভেবেছিলাম তুইতো ভেলকি ধরিস আমাকে দেখলেই। তাই ভাবছিলাম তুই ভেলকি ধরেছিস। আমাকে মাফ করে দে। " এই শুনে ঘূর্ণি বলছে," তার আগে বল, হাত কি আমি তোর ধরেছি না তুও যেচে আমার হাত ধরেছিস। তোকে আমি মাফ করতে পারি যদি তুই আমার মন ধরতে পারিস নয়তো এ কসুরের কোন মাফ আমার অভিধানে জানা নাই।" এই শুনে স্বর্ণ বলছে," হাত যখন ধরতে পেরেছি তখন তোর মনও ঠিক ধরতে পারব। তবুও অর্জিত পাপ খণ্ডাতে চাই। " এই শুনে ঘূর্ণি বলল," তবেতো কথাই নাই তুই পাপ মুক্ত হলি। এবারে তোর স্লোগান পাল্টাবি এক পুরুষ এক নারী মিলেমিশে সংসার গড়ি!" এরুপর? ----------! থাকনা কিছুটা আকাঙ্ক্ষা। 

Wednesday, October 6, 2021

রূপার মা -- ধীরেন গোস্বামী

রূপার মা
ধীরেন গোস্বামী
--------------------------


রানুর মায়ের সাথে রূপার মায়ের খুব ভাব
রানু আর রূপা একই স্কুলে একই ক্লাসে দুজনে পড়ে
তাই স্কুলে যাতায়াত করে মায়েদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে
কিন্তু আজ কদিন হলো রূপার মা রূপাকে নিয়ে 
আর স্কুলে আসছে না দেখে
রানুর মা খুব চিন্তায় পড়ে যায়, 
তাই রবিবার দিন রানু কে সঙ্গে নিয়ে রানুর মা রূপাদের ঘরে খোঁজ খবর নিতে আসেন 
রূপার মা রানুর মাকে দেখে বললো আর বোলো না ভাই 
যা ঝড় গেলো, 
রানুর মা বললো কি রকম ?
রূপার মা বললো বসো বসো আগে চা করি
চা খেতে খেতে সব কথা হবে
রানুর হাতে একটা বাটিতে কতকটা চাঁছি দিয়ে বললো এটা তুই খা এটা ঘরের দুধের চাঁছিরে
খুব সুন্দর খেতে দারুণ স্বাদ,
রানুর মা বললো বা ঘরে গরুও আছে দেখছি 
রূপার মা বললো চা করে নিয়ে আসি
এসেই সব বলছি 
কিন্তু এই কথা ভাই আর পাঁচ কান
করা চলবে না
নইলে আমি সমস্যায় পড়ে যাব
বলেই চা বানাতে চলে গেল,
চা নিয়ে এসে বললো এই চা খাও
ঘরের খাঁটি দুধের চা
রানুর মা বললো এবার কথা টা কি বলুন শুনি,
রূপার মা বললো বলছি বলছি চা টা খাও
গল্প আরম্ভ করলো
আর বোলো না ভাই তোমাকে তো আগেই
বলে ছিলাম যে আমার স্বামী ছোট থেকেই 
স্টেশনের পাশে ডাক্তার বাবুর চেম্বারে কাজ করে ডাক্তার বাবু খুব ভালো মনের মানুষ গো
আমার স্বামী কে খুউব ভালো বাসে
বলেই এক চুমুক চা খেলো
রানুর মা ও এক চুমুক চা খেয়ে বললো তার পর কাজ এখন করছে তো ?
রূপার মা বললো বলছি চায়ের কাপ টা শেষ করে পাশে নামিয়ে রেখে বললো জানো তো আমার স্বামীর মনটা খুব দয়ালু 
এই যে আমার ঘরে এতো দুধ হয় ও বলে সবাই কে খাওয়াও প্রতিদিন ডাক্তার বাবুর জন্য চেম্বারে যাওয়ার সময় এই দুধ দিয়ে কিছু না কিছু খাবার করে নিয়ে যাবেই ডাক্তার বাবুর জন্য
রানুর মা অধৈর্য হয়ে বললো এতো দিন স্কুল কামাই হলো রূপা স্কুলে যাচ্ছে না 
এর সঙ্গে তো স্কুল কামাই এর কোন যোগ নেই
রূপার মা বললো, আছে গো আছে বিরাট এক্সিটেণ্ড ওই উপর ওয়ালা মানে ভগবানের করুনা
আর ডাক্তার বাবুর পাকা হাত যশ
আমার স্বামী ডাক্তার বাবুর চেম্বারে যাওয়ার সময় দেখতে পায় লাইন উপরে একটা বড়ো দুধেল গাই চরে বেড়াচ্ছে, এদিকে রেড সিগন্যাল হয়ে আছে
ওর তো দয়ার শরীর আর কি বলবো ভাই যেই গাই টার লেঁজ টা ধরে তাড়াতে গেল ওমনি আনাড়ি লোক দেখে গাই টা জোরে মারল
এক চাঁটি ব্যস্, 
রানুর মা বললো তারপর ?
রূপার মা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললো তারপর, ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যেই করেন,
রানুর মা বললো, দিয়ে কি হলো, 
আর কি বলবো ভাই লাইনের উপরেই দড়াম করে পড়ে গেল
রানুর মা বললো যাক কোনো বিপদ হয় নাই তো ?
রূপার মা বললো, বিপদ বলে বিপদ এক্সপ্রেস ট্রেন ঝাঁ করে পার হয়ে চলে গেলো
রানুর মা বললো, ও মাগো দাদার কিছু হয় নাই তো 
রূপার মা বললো হয়ে ছিলো ট্রেন টা চলে যেতেই প্রচুর ভিড় হয়ে ছিলো
রানুর মা বললো ভিড় হোক
দাদার কিছু হয় নাই তো, 
রূপার মা বললো না তেমন কিছু হয় নাই
শুধু গাই টার সামনের দিক টা
আর আমার স্বামীর কোমর পর্যন্ত গুড়ো করে
দিয়ে চলে গেলো-
-ডাক্তার বাবু ভাগ্যিস ওই সময় ওই খানে পৌছে যায় আমার স্বামীকে চিনতে পেরে স্বামী কে আর ওই গাভী টিকে তুলে নিয়ে গিয়ে অপারেশন টেবিলে রেখে গাভীর পিছনটা আর আমার স্বামীর সামনেটা জুড়ে দেন ডাক্তার বাবু 
রানুর মা বললো তারপর
রূপার মা বললো 
কি সুন্দর সেলাই করেছে গো
কিচ্ছু বোঝার উপায় নাই 
এখন সম্পূর্ণ সুস্থ প্রতিদিন কাজে ও যায়
সকালে বিকেলে মিলে পাঁচ ছয় সের দুধ ও দেয় 
রানুর মা বললো বাবাঃ তোমার কি ভাগ্য গো দিদি 
আমার স্বামীটা তো কুড়ের বাদশা,
রূপার মা বললো চাইলে তুমি প্রতিদিন দুধ এখান থেকে নিয়ে যেতে পারো
এমন সময় রূপা ও রূপার বাবা বাজার করে বাড়ি ডুকতেই
রানু র মা বললো, কি দাদা কেমন আছেন আপনি 
এখন আর পায়ের কোন অসুবিধা নেই তো
পায়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো আপনার ধুতিটা একটু উপর দিকে তুলুন তো দাদা 
আমি আপনার পা দুটো একবার দেখবো,
রূপার বাবা অবাক হয়ে বললো তার মানে,
রূপার মা হো হো করে হেসে উঠলো, বললো তুমি ভাই স্কুলে অনেক হাসি মজার গল্প শোনাও
তাই আজ তোমাকে ঘরে একা পেয়ে
ফাঁকা সময়ে 
একটা ছোট্ট নমুনা দিলাম মাত্র দেখলে তো
বানিয়ে গল্প বলতে আমি ও জানি।

ছাত্র যখন শিক্ষক ডঃ সঞ্জীব রায়


ছাত্র যখন শিক্ষক
------------------------
ডঃ সঞ্জীব রায়
------------------------



রাহুল ছেলে হিসেবে বড়ই ভালো। একটাই দোষ, পড়াশোনায় মন নেই। বাবা-মা আর এক বোনকে নিয়ে সংসার। বেশ কষ্টেই চলে।  বাবা হঠাৎ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। নবম শ্রেণীর ছাত্র রাহুল পারলৌকিক ক্রিয়া মিটে যাওয়ার কয়েকদিন পর স্কুলে হাজির হয়।

প্রথম দিনেই দ্বিতীয় ক্লাসটি অনিলবাবুর, ইংরেজি। অত্যন্ত বদরাগী অনিলবাবু কারণে-অকারণে প্রহার করেন। সেদিন তিনি Tense পড়াচ্ছিলেন। রাহুলকে জিজ্ঞাসা করলেন, "আমার বাবা ৭দিন ধরে জ্বরে ভুগিতেছেন - এর ইংরেজি কী হবে?" পড়া না পারলে রাহুল চুপ করেই থাকে। সেদিন কি হলো, ছলছল চোখে বলে ফেলে "আমার বাবা একমাস আগে গত হয়েছেন।" ক্লাসের দুষ্টু ছেলেরা না বুঝেই হেসে ওঠে৷ রেগে অনিলবাবু পাগলের মত রাহুলকে প্রহার করতে শুরু করেন। খবর পেয়ে হেডমাস্টারমশাই অত্যন্ত বিচলিত হয়ে প্রচন্ড কাঁপতে থাকা রাহুলকে একটি ছেলের সঙ্গে বাড়ি পাঠান।

দুদিন পরে অনিলবাবু কি মনে করে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় নিজের নাম গোপন করে রাহুলকে দেখতে যান। দরজার সামনে সাদা কাপড় পরিহিতা এক মহিলা নিজেকে রাহুলের মা বলে পরিচয় দিলেন। কঠিন হৃদয় অনিলবাবুর মূহুর্তের উপলব্ধি, হয়ত রাহুল সত্যি কথাই বলেছিল। জিজ্ঞাসা করেন "রাহুল এখন কেমন আছে ?" উত্তরে মা বলেন, "জ্বর আছে। দুজন সহপাঠী বলেছিল স্কুলের মাস্টারমশাই অনিলবাবু ওকে খুব প্রহার করেছেন। কিন্তু আমি জিজ্ঞাসা করলে বলে - মা উনি খুব ভালো। আমি বন্ধুদের সঙ্গেই মারামারি করেছি।" অনিলবাবু আর বসতে চাননি।

বিদায় নেবার মুহূর্তে রাহুলের মা হাতজোড় করে বলেন, "মহাগুরুনিপাত বছর, খুব ভয়ে আছি ওকে নিয়ে। দয়া করে একটু আশীর্বাদ করে দেবেন।" অনিলবাবু তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়।