ঘুমের আগে
কাজল মুখোপাধ্যায়
৪ইমার্চ,' ২৬
আর একটা নতুন দিনের সকাল। সকালের ব্রেকফাস্ট চা খেয়ে অনির্বাণ তৈরি হয়ে গেল বেরোনোর জন্য।মায়া রান্নাঘরে ছিল,অনির্বাণ ব্যাগে একটা জলের বোতল, ডায়রি , পেন আর চশমার খাপটা নিয়েছিল, মায়াকে আলাদা করে বলার ছিল না, সে তো জানতই ।শুধু যাওয়ার আগে অনির্বাণবলল, 'আমি আসছি'।
মায়া জিজ্ঞেস করেছিল, 'ট্রেন কটায়?'
'ন’টা পনেরো।'
'দুপুরে ফিরবে?'
অনির্বাণ একটু থেমে বলেছিল,
চেষ্টা করব।
এই “চেষ্টা করব”-এর মধ্যে কোনও অনিশ্চয়তা ছিল না,ছিল শুধু বাস্তব।
স্টেশন থেকে যখন সে বেরোল,রাস্তাটা কিন্তু তার চেনা ছিল না।
মোবাইলটা পকেট থেকে বের করে অনির্বাণ মেয়েটিকে ফোন করল, মেয়েটি অনির্বাণকে স্কুলের পথনির্দেশ পরিষ্কার করে জানিয়ে দিল ফোনে।
আজ আর নতুন জায়গায় যেতে অনির্বাণের অস্বস্তি লাগছিল না, সেটা কাল রাতেই চলে গেছে।
আজ কেবল গন্তব্যস্থলে যাওয়া, মেয়েটার দেওয়া দিক নির্দেশ মত।
স্কুলটা ছোটো, সামনে সাইনবোর্ডের স্কুলের নাম লেখা,কয়েকটা ঘর, মাঝখানে উঠোন। মেয়েটি স্কুলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা, অনির্বাণ মেয়েটিকে দেখে আন্দাজ করেছিল, সামনে গিয়ে পরিচয় দিতে মেয়েটি অনির্বাণকে হাতজোড় করে নমস্কার করল, তারপর উচ্ছসিত হয়ে বলল ,'আপনি এসেছেন '? এই কথাগুলোর মধ্যে বিস্ময় ছিল না, ছিল স্বস্তি।
অনির্বাণকে লাইব্রেরী ঘরের দিকে নিয়ে গেল মেয়েটি।লাইব্রেরি ঘরের একদিকে একটা বইয়ের আলমারি,তার মধ্যে কয়েকটা নতুন-পুরোনো বই,কিছু পাঠ্যবই, কিছু গল্প, প্রবন্ধের বই।
'এইটা তোমাদের লাইব্রেরি?' অনির্বাণ জিজ্ঞাসা করল।
মেয়েটি বলল, 'হ্যাঁ আগেও ছিল ,তবে মাঝে বন্ধ ছিল অনেকদিন ,এখন আবার শুরু করার চেষ্টা হচ্ছে'।
ঘরের মধ্যে জনা বিশেক ছোটো ছোটো ছেলে মেয়ে বেঞ্চে বসে ছিল, কয়েকজন নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল, কয়েকজন আমার মন দিয়ে বই পড়ছিল।
অনির্বাণকে ওই ঘরে প্রবেশ করতে দেখে ,কৌতূহলে তার দিকে তাকিয়ে থাকল তারা।
মেয়েটি ধীরস্বরে বলল,'ওরা জানে না আপনি কে।'
অনির্বাণ হালকা হেসে বলল,'আমিও ঠিক জানি না।'
অনির্বাণ তাদের সামনে চেয়ারটায় বসে পড়ল,তারপর বলল,তোমরা কী কী বই পড়তে ভালোবাসো?
প্রথমে কেউ কোনো উত্তর দিল না, এরপর একটা ছোট মেয়ে একটু আস্তে করে বলল, 'গল্পের।'
এই শব্দটার মধ্যে দিয়ে ঘরের ক্ষনিকের নীরবতাটা যেন সরে গেল। অনির্বাণ বলল,'আমিও গল্পের বই পড়তে ভালোবাসি'।
এরপর অনির্বাণ নিজের স্কুল জীবনের কথা কিছু কিছু বলল,নিজের স্কুল লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়াশোনার কথা বলল , ছোটবেলায় কীভাবে গল্পের বই খুলে গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়ত, তখন খেলা বা খাওয়ার কথাও মনে থাকতো না তার ।ছেলে মেয়েগুলো মন দিয়ে অনির্বাণেরকথা শুনছিল, তারা অনির্বাণের কথায় লাইব্রেরী আর গল্পের বই পড়াসম্বন্ধে বেশ উৎসাহিত হয়ে পড়েছিল, এটা তাদের চোখ মুখ দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছিল।
মেয়েটি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল,মেয়েটি বুঝতে পারছি না লাইব্রেরী সম্বন্ধে তার পরিকল্পনা সফল হতে চলেছে।
কিছুক্ষণ পরে ওই স্কুলের প্রধানশিক্ষক এসে ওই ঘরে ঢুকলেন।
মেয়েটির পাশে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন অনির্বাণের কথা শুনছিলেন তিনি,তারপর মেয়েটিকে বললেন,'এই ভদ্রলোক কে?মেয়েটি একটু ইতস্তত করে বলল,'উনি… আজ এসেছেন… বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলতে লাইব্রেরীর বিষয়ে, আমিই ওনাকে ডেকেছি,'
প্রধান শিক্ষক অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আমি এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক,আপনি কি স্কুল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে স্কুল লাইব্রেরীতে এসেছেন?'
অনির্মাণ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল।
বুঝতে পারল ,এই প্রশ্নটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তাই অনির্বাণ প্রশ্নটা শুনে একটু চুপ করে থাকল,তারপর বলল,'না।'
প্রধান শিক্ষক বললেন,'এইসব ব্যাপার এভাবে করা যায় না।'
অনির্বাণ মাথা নেড়ে বলল,'আমি ঠিক জানি না,তবে আপনি বললে আমি এখনই চলে যাব এখান থেকে'।
প্রধান শিক্ষক কিছু একটা ভাবলেন,তারপর ওই ঘরের বেঞ্চে বসা ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের দিকে তাকালেন।
এরপর বললেন, 'না না, আজ থাকুন,আপনি যে রকম ভাবে ওদের সাথে কথা বলছেন সেটাই করুন'।
এই কথাটা কোনও অনুমতি নয়,কিন্তু অনির্বাণ বুঝতে পারল,এই “আজ থাকুন” মানে অন্তত আজকের দিনের জন্য অনুমতি পাওয়া।
দুপুরে ফেরার সময় মেয়েটি স্কুলের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল অনির্বাণকে।
'আজকের পরে আপনি আবার আসবেন তো?'
এই প্রশ্নে তেমন কোনও প্রত্যাশা ছিল না,শুধু জানতে চাওয়া।
অনির্বাণ একটু ভেবে বলল,'হ্যাঁ, যদি প্রধান শিক্ষক অনুমতি দেন , তাহলে আমাকে জানিও'।
এই “হ্যাঁ” বলার সময় সে নিজেই বুঝল,এটা শুধুই কথার কথা।
ফেরার সময় স্টেশনের পাশের একটা হোটেলে ঢুকে অনির্বাণ দুপুরের খাবার খেয়ে নিল।
ফেরার ট্রেনে বসে তার মনে হল,আজ সে কোনও বড় কাজ করেনি,কাউকে বিশেষ সহযোগিতা করেনি
কোনও নতুন ব্যবস্থা তৈরি করেনি।
কিন্তু আজ সে নিজের একটা ভুল ধারণা ভেঙেছে, অবসরের পরে সে এতদিন ভেবেছিল,তার সব দরকার ফুরিয়ে গেছে,আজ সেই ভাবনাটার অনেকটাই বদলে গেল।
সন্ধ্যায় বাড়ি ঢুকতে মায়া বলল, 'সারাদিন কিছু খেয়েছো'?
অনির্বাণ বলল ,'হ্যাঁ হোটেলে খেয়ে নিয়েছি',এরপর বলল,'আজ লাইব্রেরীতে গিয়ে ছোটোছোটো ছেলেমেয়েদের সাথে কথা বলে ভালো লাগল।
মায়া মাথা নেড়ে বলল,'আমি বুঝতে পেরেছি।'
অনির্বাণ একটু হেসে ফেলল,'কী করে?'
মায়া কাপে চা ঢালতে ঢালতে বলল,'আজ তোমার মুখের ভাব যেরকম,কাল তেমন ছিল না।'
এই কথাটার ব্যাখ্যা অনির্বাণ জানতে চাইল না,তার দরকারও ছিল না।
রাতে ঘুমোবার আগে সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ বাইরের তাকিয়ে রইল,এই শহরে হাজার হাজার মানুষ কাজ করে,হারে, জেতে, ভুল করে, ফিরে আসে,কিন্তু আজ তার নিজের সাথে একটা ছোটো ঘটনা যেন নিঃশব্দে আলাদা হয়ে গেল,কোনও খবরের কাগজে নয়,কোনও ফলকে নয়,শুধু তার নিজের কাছে ।
এই কারণে, আজকের দিনটা তার কাছে মনে রাখার মত একটা দিন হয়ে রইল, কারণ সে জানে লাইব্রেরীটাতে সহযোগিতা করার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষেরঅনুমতি পাক আর না পাক,ওই স্কুলের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েগুলোর কাছে সে যে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পেরেছিল,এটাই তার আজকের সাফল্য।
No comments:
Post a Comment