কাঠের ঘোড়া
সমরেন্দ্রনাথ ঘোষ
26/02/26
রহমত মিঞা ও বিশু ঠাকুর দুজনেই এই গলিটার পুরনো বাসিন্দা।বিশু ঠাকুর একজন নামজাদা কাঠমিস্ত্রি।রহমত মিঞার ছোট্ট ব্যাবসা আছে।বছরের পর বছর তাদের বন্ধুত্বটা ছিল এই ঘিঞ্জি গলির আস্থার প্রতীক।
নির্বাচন এসেছে।চারদিকে থমথমে ভাব।সিংহাসন দখলের লড়াইয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ময়দানে নেমে পড়েছে।
হঠাৎ বিকেলের দিকে খবর ছড়িয়ে পড়ল-শহরের ওপারে কার যেন র*ক্ত ঝরেছে।ব্যাস!আগুনের স্ফূলিঙ্গ ছড়াতে দেরি হল না।
মুহুর্তের মধ্যে বদলে গেল চারপাশ।যে হাতগুলো সকালে একসাথে চা খেয়েছিল,বিকেলে সেই হাতগুলোতে অস্ত্র উঠল।বিশু ঠাকুর তাঁর ছেলে বিট্টুকে নিয়ে ঘরে বসে কাঁপছিলেন।বাইরে স্লোগান আর ভাঙচুরের শব্দ।রহমত মিঞার ঘরটাও কাছে।কিন্তু মনে হল এক দূর্ভেদ্য দেওয়াল উঠে দাঁড়িয়েছে।
হঠাৎ চিৎকার শুনলেন বিশু ঠাকুর-"আগুন!আগুন!আগুন!"
বিশু ঠাকুরের গুদামে একদল বোমা ছুঁড়েছে।জ্বলছে তাঁর সারা জীবনের সঞ্চয়।
কোনোরকমে পাঁজাকোলা ক'রে বিট্টুকে বের করে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন অসহায় পিতা।কিন্তু বাইরে উন্মত্ত জনতা।চেনা মুখগুলো অচেনা মুখোশে ঢাকা।
গলি দিয়ে বেরুতে গিয়ে হোঁচট খেলেন বিশু ঠাকুর।একদল সশস্ত্র মানুষ চড়াও হল।তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন-"আমি বিশু!আমি তোমাদের পরিচিত!"কিন্তু ঘৃণার কোলাহলে মিনতি তলিয়ে গেল।
অন্ধকারে এক কিশোরের রড এসে পড়ল বিশুর মাথায়।বিট্টু তার বাবার নিথর দেহের উপর আছড়ে পড়ে কাঁদছে।কিন্তু দাঙ্গার কোনো ধর্ম নেই,মায়া নেই।এক পৈশাচিক উল্লাসে বিট্টুর ছোট্ট বুকটা বিদীর্ণ হয়ে গেল মরচে ধরা এক তলোয়ারে।
পরদিন পুলিশ এলো।গলিটায় শ্মশানের নীরবতা।বাতাসে পোড়া গন্ধ আর র*ক্তের ভ্যাপসা ঘ্রাণ।
রহমত ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।চোখে জল নেই।আছে শূন্য দৃষ্টি।দেখলেন -রাস্তায় পড়ে আছে বিশু আর ছেলের নিথর দেহ।বিশুর হাতে তখনও শক্ত ক'রে ধরা একটা কাঠের খেলনা ঘোড়া।আগের রাতে বিট্টুর জন্য বানিয়েছিলেন।
রহমত অস্ফূট স্বরে বললেন-"তোর রক্ত আর আমার রক্ত তো আলাদা ছিলনা বিশু...।"
পরদিন খবরে শিরোনাম হল-"রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিহতের সংখ্যা দুই।"কিন্তু কাগজে লিখলো না-বিশুর সেই কাঠের ঘোড়াটার কথা যেটার গায়ের র*ক্ত শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
No comments:
Post a Comment