Thursday, February 12, 2026

ঘুমের আগে -- কাজল মুখোপাধ্যায়

ঘুমের আগে.......
কাজল মুখোপাধ্যায় 
১০ই ফেব্রুয়ারি,'২৬
স্টেশনের বেঞ্চগুলো আগের মতোই আছে।
শুধু তার বসে থাকার ভঙ্গিটা এখন বদলে গেছে।
অনির্বাণ বসে আছে,
হাতের ব্যাগটা দু’পায়ের মাঝখানে রেখে।
কতদিন পরে এই প্ল্যাটফর্মে এল, নিজেই ঠিক মনে করতে পারে না।
রেলের চাকরির সময় এই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো মানেই ছিল তাড়া, হিসেব, হুইসলের সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনে উঠে পড়া।
আজ আর সেসব নেই।
শুধু সময়টা আছে।
অদ্ভুতভাবে আজ সময়টা খুব ভারী।
ট্রেন ঢোকার আগে প্ল্যাটফর্মে যে  নীরবতা নামে,
সে নীরবতাটা ওর কানে এসে লাগে।
মনে হয়,
এই নীরবতার মধ্যেই বোধহয় মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় কথাগুলো লুকিয়ে থাকে।
অনির্বাণ এখন অবসরপ্রাপ্ত।
শব্দটা শুনতে যেমন হালকা লাগে,
জীবনে তেমন নয়।
বাড়িতে সবাই জানে,
ও ভালো আছে।
ভালো থাকার সংজ্ঞাটা অবশ্য কেউ জিজ্ঞেস করে না।
স্ত্রী, মায়া, সকালে উঠে চা বানায়।
খুব নিয়ম করে।
চিনি মাপা, আদা থেঁতো করে দেওয়া, ফুটে ওঠার ঠিক আগেই নামানো, দুধ ছাড়া লিকার চা।
এই নিয়মগুলোই ওদের সংসারের সবচেয়ে পুরোনো ভাষা।
সাইত্রিশ বছরের দাম্পত্যে
অনির্বাণ আর মায়ার মধ্যে কথা কমেছে,
কিন্তু ভুল বোঝাবুঝি বাড়েনি,
এটা বিরল।
মাঝে মাঝে অনির্বাণ নিজেই অবাক হয়,
এতদিন একসঙ্গে থেকে মানুষ কি সত্যিই কাউকে চেনে?
নাকি কেবল অভ্যাসকে ভালোবাসা বলে চালিয়ে দেয়?
আজ মায়া জিজ্ঞেস করেছিল,
“ফিরতে দেরি হবে?”
অনির্বাণ বলেছিল,
“হতে পারে।”
কোথায় যাচ্ছ?
এই প্রশ্নটা এখন আর রুটিনমাফিক কেউ করে না, শুধু কখন ফিরবে আর নিরাপদে ফিরবে কিনা সেই ভাবনাটা!
অনির্বাণ নিজেও ঠিক জানে না।
শুধু জানে,
আজ খুব দরকার ছিল বাড়ির বাইরে বেরোনোর।
ট্রেন ছাড়ে।
একটা জানালার পাশের সিট।
চেনা শহরটা ধীরে ধীরে পেছনে সরে যায়।
অনির্বাণ জানালার কাঁচে নিজের মুখটা দেখতে পায়,
অল্প ঝাপসা,
কিন্তু বয়সটা পরিষ্কার।
এই বয়সে এসে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা বদলায়,
তা শরীর নয়।
ভিতরের গতি আর তাগিদ।
হঠাৎ পাশে বসে থাকা মেয়েটা কথা বলে।
“এই লাইনে কি সব ট্রেনই এত দেরি করে?”
মেয়েটার গলায় কোনো বিরক্তি নেই।
বরং কৌতূহল।
অনির্বাণ একটু চমকে ওঠে।
আজকাল অপরিচিত কেউ কথা বললে,
মানুষ অবাক হয়।
“হ্যাঁ… দেরি তো হয়ই।”
মেয়েটা হালকা হেসে বলে,
“আমার কিন্তু দেরি হওয়ায় ভয় লাগে না।
ভয় লাগে থেমে গেলে।”
এই কথাটুকু খুব সাধারণ মনে হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু অনির্বাণের মনে কথাটা কোথাও যেন একটু হলেও ছাপ ফেলল।
“থেমে গেলে?”
মেয়েটা জানালার দিকে তাকিয়ে বলে,
“হ্যাঁ।
সবাই তো একসময় কোথাও না কোথাও থেমে যায়।
আমি শুধু চাই, থামার আগে পর্যন্ত যেন চলাটা স্বাভাবিক নিয়মে হয়।”
অনির্বাণ চুপ করে থাকে।
কথাটা এত সহজভাবে বলা,
এটাই ওকে অস্বস্তিতে ফেলে।
“আপনি কি কাজ করেন?”
অনির্বাণ জিজ্ঞেস করে।
“করতাম।”
একটু থেমে মেয়েটা বলে,
“ছেড়ে দিয়েছি।”
“কেন?”
“কারণ ওই কাজে আমি আর নিজেকে চিনতে পারছিলাম না।”
এই উত্তরটা অনির্বাণকে অদ্ভুতভাবে ছুঁয়ে যায়।
নিজেকে চিনতে না পারা,
এই বাক্যটা ওর জীবনের অনেক জায়গায় রয়ে গেছে।
মেয়েটার নাম তনুশ্রী।
কলকাতার মেয়ে নয়।
 মফস্বল শহরে থাকে।
নাটকের দল করত।
এখন একাই ছোটো ছোটো  কর্মশালা করে।
“ভবিষ্যৎ কী?”
অনির্বাণ একটু হালকা হেসে জিজ্ঞেস করে।
তনুশ্রী খুব সহজভাবে বলে,
“জানি না।
তবে এটুকু জানি,
ভবিষ্যৎ না জানাটাই এখন আমার সবচেয়ে বাস্তব অবস্থা।”
এই কথার মধ্যে কোনো বড় দর্শন নেই।
তবু অনির্বাণ হঠাৎ অনুভব করে,
সে অনেকদিন অপরিচিত কারও সঙ্গে এমন স্বাভাবিকভাবে কথা বলেনি।
অনির্বাণের তখন মনে হয় মায়ার কথা।
মায়া কোনোদিন নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাবে নি।
তার সব পরিকল্পনার কেন্দ্র ছিল,
সংসার।
মেয়েদের পড়াশোনা।
বাড়ির খরচ।
অনির্বাণের বদলি।
অনির্বাণের ক্যারিয়ারের ওঠানামা।
মায়ার জীবনে অনির্বাণ ছিল পথ।
আর অনির্বাণের জীবনে?
এই প্রশ্নটা ও বহুদিন এড়িয়ে এসেছে।
তনুশ্রী হঠাৎ বলে,
“আপনার কি মনে হয়, মানুষ কি শেষ বয়সে এসে হালকা হতে পারে?”
অনির্বাণ একটু হেসে ফেলে।
“হালকা?”
“হ্যাঁ।
সব দায়িত্ব নামিয়ে রেখে।”
অনির্বাণ খুব ধীরে বলে,
“কিছু দায়িত্ব নামানো যায় না।
নামাতে নেইও।”
তনুশ্রী মাথা নাড়ায়।
“আমি জানি।
কিন্তু দায়িত্ব না নামিয়েও তো মানুষ নিজে থেকে বাঁচতে পারে…
এইটুকুই আমার লড়াই।”
'লড়াই'......।
শব্দটা অনির্বাণের জীবনে নতুন নয়।
তবু আজ শব্দটার মানে বদলে যাচ্ছে।
স্টেশন এসে যায়।
তনুশ্রী নামে।
নামার আগে বলে,
“আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল।”
তারপর একটু থেমে,
“আপনি কিন্তু এখনো থেমে যাননি।
আপনি শুধু একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে আছেন।”
অনির্বাণ কিছু বলতে পারে না।
মেয়েটা নেমে যায়।
ট্রেন আবার চলতে শুরু করে।
অনির্বাণ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।
মনে হয়,
সে আজ কোথাও যাচ্ছে না।
সে আজ কেবল নিজের মনের মধ্যে দিয়ে একটু হাঁটছে।
এই বয়সে এসে
মানুষ যদি নিজেকে নতুন করে চিনতে শুরু করে,
তা কি খুব দেরি হয়ে যায়?
মায়ার মুখটা চোখের সামনে আসে।
চা বানানোর সময় গ্যাসের আঁচ কমানো।
মেয়েদের ফোন এলে গলার স্বর বদলে যাওয়া।
এই ছোটো ছোটো দৃশ্যগুলোই কি আসলে ভালোবাসার সবচেয়ে স্থায়ী ভাষা?
অনির্বাণ হঠাৎ বুঝতে পারে,
ঘুমের আগে তার এখনও অনেকটা পথ চলা বাকি।
এ পথ কোনো স্টেশনের দিকে নয়।
নিজের বোধের দিকে।

সকালের আলোটা মায়ার খুব পছন্দ।
খুব উজ্জ্বল আলো নয়,
একটু ফ্যাকাশে,
একটু ধুলো মেশানো,
বাড়ির সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছটার ডাল গুলোর মধ্যে দিয়েঢুকে পড়ে যে আলো,
ওটাই।
অনির্বাণ চলে গেলে ঘরটা অদ্ভুত রকম নীরব হয়ে যায়।
শব্দ নেই, এমন নয়।
ঘড়ির কাঁটা চলে।
ফ্রিজের ভেতর থেকে হালকা গুঞ্জন আসে।
পাড়ার কুকুরটা দূরে কোথাও ঘেউ ঘেউ করে।
তবু মায়ার মনে হয়,
মানুষ থাকলে ঘরে যে একরকম শব্দ থাকে,
সেটা নেই।
অনির্বাণ বেরোনোর সময় বলেছিল,
“ফিরতে দেরি হতে পারে।”
এই কথাটুকুই।
কোথায় যাবে?
মায়া জানতে চায়নি।
এখন আর জানতে চাওয়া লাগে না।
এই সংসারে অনেক প্রশ্ন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের জায়গা বদলেছে।
আগে প্রশ্ন মানে ছিল,
উদ্বেগ।
এখন প্রশ্ন মানে,
নীরব সম্মান।

চা নামিয়ে রেখে মায়া বারান্দায় এসে দাঁড়ায়।
কাপে ধোঁয়া উঠছে।
একসময় এইরকম ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই
সে নিজের দিনগুলো কাটিয়েছে।
দু’টো ছোট মেয়ে,
একজন সদ্য বদলি হয়ে আসা রেলকর্মী স্বামী,
অচেনা পাড়া,
অচেনা বাজার,
অচেনা ভাষার টান।
তখন সে ভাবেনি,
এই শহরটাই একদিন তার সবচেয়ে পরিচিত হয়ে উঠবে।
মায়া গান শিখত।
কথাটা সে কাউকে বললে এখনো একটু অস্বস্তি হয়।
যেন কোনো অপ্রয়োজনীয় পরিচয়।
বাপের বাড়িতে হারমোনিয়াম ছিল।
তানপুরা ছিল।
রেওয়াজের সময় মা পাশে চুপ করে বসে থাকতেন।
মায়ার গলার স্বর তখন খুব পরিষ্কার ছিল।
শিক্ষক বলতেন,
“তুই চাইলে অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারবি।”
মায়া দূরে যাওয়ার কথা ভাবেনি।
তার সামনে তখন শুধু একটাই ভবিষ্যৎ ছিল,
ভালো মেয়ে,
ভালো বউ,
ভালো সংসার।
সে ভবিষ্যৎকে কখনো অস্বীকার করেনি।

কিন্তু কোনো কোনো দুপুরে,
রান্নাঘরে একা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে,
হঠাৎ নিজের বিবেকের ভেতর থেকে একটা স্বর উঠে আসত,
এই গলাটা কি কেবল ডাকাডাকির জন্যই ছিল?
মেয়েরা বড় হয়ে গেছে।
এখন দু’জনেই দূরে।
ফোনে , ভিডিও কলে কথা হয়।
ছবি আসে।
নাতি–নাতনির হাসি স্ক্রিনে ভাসে।
মায়া হাসে।
কিন্তু ফোন রেখে দিলে,
ঘরটা আবার নিজের পুরোনো আকারে ফিরে আসে।

মায়া হঠাৎ আলমারির নিচের তাকটা খোলে।
অনেকদিন পরে।
একটা পুরোনো কাপড়ের থলে।
ভেতরে তানপুরার মিজরাব।
একটা নোটবুক।
নোটবুকের পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে।
রাগ ভৈরবী।
খাম্বাজ।
ইমন।
হাতের লেখাটা তার নিজের,
কিন্তু যেন অন্য কারও।
এই বয়সে এসে
নিজের পুরোনো হাতের লেখা চিনতে সময় লাগে,
এটা তাকে একটু অবাক করে।
মায়া জানে,
অনির্বাণ কখনো তাকে গান ছাড়তে বলেনি।
সে নিজেই ছেড়ে দিয়েছিল।
এই কথাটা বলা কঠিন।
কারণ দোষ দিলে সবকিছু সহজ হয়।
নিজেকে দায়ী করলে নয়।
অনির্বাণের সঙ্গে তার ঝগড়া খুব একটা হয়নি।
বড় ঝগড়া তো নয়ই।
ছোটখাটো অভিমান ছিল।
কিন্তু সেগুলো এমন কোনো অভিমান নয়,
যা সংসার কাঁপিয়ে দেয়।
বরং ঠিক উল্টো।
এই সম্পর্কটা এতটাই মসৃণ ছিল যে,
কখন কোথায় নিজের মান অভিমানগুলো ফিকে হয়ে গেছে,
সে খেয়াল রাখেনি।
মায়া জানালার ধারে বসে পড়ে।
সামনের রাস্তায় স্কুলবাস যাচ্ছে।
একজন মা ছুটে এসে জানালা দিয়ে বাচ্চার হাতে জলের বোতল দিয়ে গেল।
দৃশ্যটা খুব সাধারণ।
কিন্তু মায়ার বুকের ভেতরে কোথাও যেন কিছু পুরনো স্মৃতিগুলো মনে পড়ে যায।
সে নিজের মেয়েদের এমন করেই স্কুল বাসে উঠিয়ে দিয়েছে কতদিন।
 সেসব করতে করতে একসময় নিজের শখ ইচ্ছে গুলো ভুলে মেরে দিয়েছিল।

হঠাৎ তার মনে পড়ে,
ক’দিন আগে অনির্বাণ বলেছিল,
“তুমি আবার গানের রেওয়াজ করছো শুনেছি।”
মায়া কিছু বলেনি।
হালকা হেসেছিল।
গানটা সে খুব জোরে গায় না।
পাড়ার কেউ শুনবে,
এই লজ্জা এখন আর নেই।
কিন্তু অনির্বাণ শুনলে কী ভাববে,
এই সংকোচটা রয়ে গেছে।
মায়া ধীরে ধীরে তানপুরাটা বের করে আনে।
পুরোনো কাঠের গায়ে ছোট ছোট দাগ।
একটা সময় ছিল,
এই যন্ত্রটার পাশে বসে থাকলেই
নিজেকে ঠিক জায়গায় আছে মনে হতো।
এখন একটু ভয় করে।
এই ভয়টা বয়সের নয়।
নিজেকে আবার ফিরিয়ে আনার ভয়।
সে আলতো করে তারে হাত বুলিয়ে দেয়।
শব্দটা ঠিকমতো ওঠে না।
দু’একটা তার ঢিলা।
মায়া খুব সাবধানে ঠিক করে।
তারপর খুব নিচু গলায়,
একটা ইমন।
সুর ভাঙে।
আবার ধরে।
ভাঙে।
তারপর ধীরে ধীরে ঠিক জায়গাটা খুঁজে নেয়।
মায়ার চোখ ভিজে আসে।
এই কান্না দুঃখের নয়।
এই কান্না অনেকদিন জমে থাকা নিজের কাছে ফিরে পাওয়ার।

সে হঠাৎ থেমে যায়।
দরজার শব্দ।
চাবির আওয়াজ।
অনির্বাণ?
মায়ার মনটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে ওঠে।
সে তানপুরাটা নামিয়ে রাখে।
চোখ মুছে নেয়।
কিন্তু দরজায় কেউ ঢোকে না।
ভুল।
পাশের ফ্ল্যাটে।
মায়া হালকা নিঃশ্বাস ছাড়ে।
নিজের অজান্তেই।

সে বুঝতে পারে,
অনির্বাণের সামনে নিজের এই নতুন ফিরে আসাটা দেখাতে তার এখনও সময় লাগবে।
সব ভালোবাসাই যে একসঙ্গে সাহস হয়ে ওঠে না।
মায়া আবার জানালার দিকে তাকায়।
রাস্তায় আলো একটু বেড়েছে।
তার মনে হয়,
অনির্বাণ আজ ফিরলে
সে তাকে কিছু বলবে না।
শুধু চা বানিয়ে দেবে।
কিন্তু আজ চায়ের পাশে
একটা অন্য নীরবতা থাকবে।
যেটা এতদিন ছিল না।
মায়া জানে,
এই সংসার ভাঙছে না।
কিন্তু এই সংসারের ভেতরে
সে একটু নতুন করে জায়গা বানাচ্ছে।
নিজের জন্য।
আর এই জায়গাটা
কারও থেকে চুরি করা নয়।

দূরে কোথাও ট্রেনের হুইসল শোনা যায়।
মায়া জানে না,
ওই শব্দটা অনির্বাণের ফেরার সংকেত কি না।
কিন্তু শব্দটা আজ আর তার কানে লাগে না।
আজ ওই শব্দটার ভেতরেও
সে নিজের একটা সুর খুঁজে পায়।

No comments: