পারুলের স্বপ্ন
পারমিতা চ্যাটার্জি
২৩/০৮/২৫
মোহন ঘরে ফিরে এসেছে গিন্নি পারুল আর মেয়ে আলপনা দুজনেই দুরকম কাজে ব্যাস্ত পারুল নামিয়েছে
সবে এক কড়াই তরকারি লোটা মাছের সাথে আলু কুমড়ো বেগুন দিয়ে পেঁয়াজ রসুন দিয়ে জমপেশ করে বানান খুব গন্ধ বেরিয়েছে। কিন্তু মোহনের মাছের সাথেলের শ অত তরকারি দিয়ে খেতে ভাল লাগেনা। অনেকদিন বউকে বলেছে এরকম করে করবিনা।
আরে খেতে তো ভাল হয় আগুন বাঁচে মেয়েটাকে শহরে নিয়ে পড়াতে তো খরচ আছে। পারুলের শখ মেয়েকে খুব শিক্ষিত করে তোলা।
তারজন্য রোজ এই অখাদ্য খেতে মোটে ভালো লাগে না দুবেলাই এক তরকারি। আমিও তো খাটছি ভালমন্দ খাওয়া রোজ না হলেও মাসে একদিন তে খেতে পারি?
আরে তোর মেয়ের পড়ার টাকার অভাব হবে না। রাতে মুরগী নিয়ে আসব ভাল করে রাঁধিস আর পাশের বাড়ির বকুল কে একটু দিয়ে আসিস। হ্যাঁ একবাটি তরকারি বকুলকে আমি রোজ দি,
তাইনাকি? তাইজন্য একরান্না রোজ তা বেশ করেছিস তোর যে মনটা এত বড় তাতো জানতাম না। পারুল বলল, ভাবছি সামনের মাসে আলপনার সাথে বকুলকেও স্কুলে ভর্তি করে দেব,
হ্যাঁ দিস আজকাল মেয়েদের পড়াশোনা খুব দরকার। বিয়ের চেয়েও পড়াশোনার দরকার আরও বেশি।
পারুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল অত ভাল করে মাধ্যমিক পাশ করলাম কেউ আমার পড়ার জন্য একটুও ভাবলনা।
উফ্ আবার ফ্যাচফ্যাচানি আরম্ভ হল। তখন বাবা মা ছিল সামনে আমার বোনের বিয়ে ছিল কত খরচা করে বোনটার বিয়ে দিলাম তাও সামান্য রাখী কেনার অপরাধে বোনটাকে আমার মেরেই ফেলে দিল। দাদা দাদা করে পাগল ছিল মেয়েটা এখনও ওর মুখটা মনে পড়লে চোখের জল সামলাতে পারিনা। তখন তোর পড়াশোনা নিয়ে ভাববার মতন মন ছিল আমার। তোমার মায়ের শরীর খারাপ ছিল বলে আমাকে তো অল্প বয়েসেই বিয়ে দিয়ে নিয়ে এসেছিলে তোমরা। হ্যাঁ তুই আর বনু একসাথে পড়তিস রাতের রান্না মা করতেন,
রাতের রান্না আর কি ছিল শুধু ভাত আর রুটি কখানা সকালেই তো আমি আর বনু সব করে রাখতাম। কাজ তো কম ছিলনা,
থাক আর হিসাব দিতে হবেনা,
আচ্ছা আমার বাবা মা তো প্রায় কিছুই দিতে পারেনি,
আমরা তো চাইনি। আমরা বাপ বেটা ছিল যা আছে তাই দিয়ে চলবে প্রাণপণ খেটে রোজকার করব কিন্তু চাইব কেন?
আমার মা খালি কানের একজোরা দুল আর তোমাকে আংটি আর সবাই নাকফুল শেষকালে দিদি কেঁদে জামাইবাবুকে বলল, আমাকে মা হাতের গয়না দিয়েছিল আমার বোনটার হাত খালি থাকবে! তখন প্রায় শেষমুহুর্তে জামাইবাবু দুটো পলারবালা নিয়ে এল আর মামারা ঘড়ার সাথে হলুদ তোলা শাড়ি তার সাথে আর একটা ভাল ঢাকাই শাড়ি একটা আমার হাতে আংটি দিয়েছিল, জামাই বরণ করেছিল রূপোর আঙটি দিয়ে,
আহা মানুষ আর কত দেবে? অনেক দিয়েছে,
তাই ভাবি তোমাদের এত উঁচু দরের মন আর তোমাদের বাড়ির মেয়েকেই এমন করে মেরে দিল, ছেড়ে দিলে শয়তানটাকে? ওর ফাঁসি হওয়া উচিৎ ছিল। লড়েছিলাম তো প্রাণপণ আমি আর বন্ধু পলাশ কিছুই করতে পারলাম না। যাক আমার মেয়েকে একেবারে বিএবিটি পাশ করিয়ে সরকারি স্কুলে পরীক্ষার বসাব একবার না হলে বারবার দেবে বিয়ের কথা ভাববোইনা। আর শক্ত করে তৈরি করবে গায়ে হাত তুলতে এলেই চেঁচামেচি হৈচৈ করে আর ওকে তো কুস্তি শিখিয়েছি ও ঠিক বেরিয়ে আসতে পারবে,
আগে তো বিএটা পাশ দিক তারপরের কথা পরে আর এবারে যারা চাইবে সেরকম ঘরে বিয়ে দেবোই না।
মানুষ স্বপ্নের কাজল পড়তে ভালবাসে পারুলও স্বপ্ন দেখে তার মেয়ে স্কুলের দিদিমনি হবে একদিন তারজন্য তাকে আরও পড়াতে হবে ওই যে দিদিমনি হতে গেলে যে ট্রেনিং লাগে সেই ট্রেনিং। যা তার নিজের একদিন স্বপ্ন ছিল হয়নি তার মেয়েকে সে সফল করবেই।
মাঝে মাঝে উদাস হয়ে ভাবে আর তার মেয়ে কি তার স্বপ্ন সত্যি সফল করতে পারবে, ভাবতে ভাবতেই আবার
মাংস রান্নায় মন দিল। অনেক দিন পরে মাংস এনেছে রান্না খারাপ হলে রাগ করবে মানুষ টা।
শেষপর্যন্ত আলপনা বি এ পাশ করল আর বকুলকেও পারুল মাধ্যমিক পাশ করিয়ে ছাড়ল। ওর মা শহরে যায়
বাবুদের বাড়ি রান্না করতে। কষ্টে শিষ্টে চলে যায়।
পারুল আলপনার সাথে বকুলেরও একটা করে জামা করে। তবে এখন আলপনা হয় শাড়ি পড়ে নয়ত সালোয়ার কামিজ পরে। সালোয়ার কামিজই বেশি পরে।
বকুলের মা বলল দিদি বকুল কি আর পড়বে? আমি তো যা রোজগার করি তাতে দুবেলা রান্না জ্বালানি কেরোসিন এসব কিনতেই চলে যায়।
তোমার খালি নেই নেই স্বভাব। আমরা তো দেখি না না কি? বকুলের অত ভাল রেজাল্ট ও পড়বে না মানে? ও কে পড়তেই হবে। আলপনার সাবজেক্ট ও নিক সব বই পেয়ে যাবে।
শেষ পর্যন্ত বকুল উচ্চমাধ্যমিকে আর আলপনা বিএডে ভর্তি হতে হল।
ওরা দুজনেই দেখেছে ওদের পড়ানোর জন্য মা বছরে দুটোর বেশি কখনও শাড়ি কেনেনি ওদের কলেজ যেতে হত বলে পয়সা বাঁচিয়ে সালোয়ার-কামিজের সেট কিনে দিত। নিজের প্রচণ্ড ইচ্ছে সত্বেও কিছুই করতে পারলনা।
সেলাই করে রোজকার করত শেষপর্যন্ত একে ওকে ধরাধরি করে প্রাইমারি স্কুলে চাকরি নিল সেই সাথে বাড়ির সামনে টা একটু ঘিরে নিয়ে সেলাইয়ের দোকান দিল। ব্লাউজ, সালোয়ার কামিজ , শাড়ির ফলস লাগান, মেয়েদের ফ্রক সেলাই করে মোটামুটি চালিয়ে নিত। মেয়েদুটো সময় মতন সেলাইয়ে মাকে সাহায্য করত। খাওয়াদাওয়ার একটু ভাল ব্যাবস্থা করতে পেরেছিল পারুল। রাতের বেলায় শুতে এসে বর যখন গায়ে হাত বুলিয়ে বলত সারাজীবন কষ্ট করেই গেলি, এখন মেয়ে দুটো মানুষ হলে তোর স্বপ্ন পূরণ হয়। আমার দোকান থেকেও এখন আয় পয় ভালই হচ্ছে এবার থেকে নিজেও একটু ভালো করে খাবি শরীরটা ভেঙে যাচ্ছে তো!
কিছু ভাঙছেনা তুমি অত চিন্তা কোর না তো।
আলপনা অনেক দিন ধরে টিউশনের চেষ্টা করছে পেয়েও গেল কলকাতার কাছেই একটা আর একটা নিজেদের গ্রামে। বকুল উচ্চমাধ্যমিকের সাথে সাথে নার্সিং ট্রেনিং নিতে শুরু করল তার সাথে সাথে লোকের বাড়ি রক্ত নিতে যাওয়া চ্যানেল করা সেগুলো আবার ল্যাবে দিয়ে আসা আার রিপোর্ট নিয়ে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া এই করে সেও রোজকার শুরু করল। আলপনা বাড়িতে আসার সময় চারজনের চারটে বড় কলা মাখন রুটি সব কিনে আনত।
খাওয়া দাওয়া ভালোই চলছিল যতটা পুষ্টিকর খাওয়া বাবা মাকে দেওয়া যায় মেয়ে দুটো চেষ্টা করত।
এইভাবেই দিন চলতে লাগল। আলপনা বুঝতে পারছিল অতিরিক্ত পরিশ্রমে মায়ের শরীর ক্রমশ ভেঙে পড়ছে।
সে সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিয়েছিল কিন্তু রেজাল্টের অপেক্ষা না করেই একটা প্রাইভেট স্কুলে ভাল মাইনের চাকরি নিল।
বকুলের মা শহরের কোন বাবুর সাথে থাকতে শুরু বকুলের নামে বাড়িটা লিখে দিল।
বকুল রেগে গিয়ে বলল আমাকে তো চিরকাল তুমিই দেখেছ পারুল মা আজ থেকে তুমি আমার শুধু মা।
পারুল তার ক্লান্ত দূর্বল বুকে টেনে নিল। পারুল বকুলকে বলল তুই কতকিছু শিখছিস রে ভাল রোজকার করিস দেখবি পণের জন্যে যেন খুন হতে না হয়।
বকুল নার্সিং ট্রেনিং থেকে শুরু করে ল্যাব টেকনিশিয়ান হয়ে উঠল। বড় সরকারি হাসপাতালে চাকরি পেল। জোর করে পারুলকে বলল এবার সেলাই টেলাই বন্ধ কর তো অনেক হয়েছে আমি আর দিদি দুজনেই ভাল চাকরি করছি নাও ওই দুধটুকু খেয়ে নাও না খেয়ে শরীরের যা হাল বানিয়েছ।
সেদিন সকাল থেকে আকাশটা মেঘলা মনে হচ্ছে যেন ভারি বৃষ্টি হবে, আলপনা খুব তাড়াতাড়ি স্কুল থেকে ফিরছে হাতে তার সরকারি স্কুলের অফার লেটার এই গ্রামেই পোস্টিং পেয়েছে খুব খুশি সে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করেছে, মায়ের চোখের নীচে গাঢ় কালি পড়েছে মনে হয় যেন স্বপ্নের কাজল পরে আছে।
আলপনা দৌড়ে দৌড়ে এসে দেখল মা তার সেলাইয়ে ঘরে বসে বসেই যেন ঢলে পড়েছে, ওর পেছনে বকুলও এসে দাঁড়িয়েছে ওদের বাবাও যেন প্রাণপণে কান্না চাপার চেষ্টা করছে, বকুলের অভ্যস্ত চোখ সব বুজতে পারল কাছে এসে পারুলের মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, দিদি মা আর নেই রে মা আর নেই
আলপনা তখন চিৎকার করে কেঁদে উঠে বলল মা তোমার স্বপ্ন যে সফল করলাম তুমি তোমার জন্য কিছু করার সুযোগ দিলেনা চলে গেলে।
পারুলের স্বপ্ন সফল হলে কিন্তু পারুল চলে গেল। পরিবারটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।