Thursday, July 31, 2025

শ্মশাণে ভুতের ভয় -- অজয় চক্রবর্তী

 শ্মশাণে ভুতের ভয়
 অজয় চক্রবর্তী
 ৩০  ০৭  ২০২৫
গ্রামটার নাম ঝিঙেশালী। বেশ বড়সড় গ্রামটায় সকলেরই চাষবাসের উপর জীবন নির্ভরশীল। বেশিরভাগই মাটির কাঁচা বাড়ি। সারা গ্রামে ঘুরে এলে হাতেগোনা তিন চারটি  দালান বাড়ি দেখতে পাওয়া যাবে। বর্ষাকালে পুরো গ্রামটাই জলের উপর ভেসে থাকে। এখনো বিদ্যুৎ প্রবেশ করেনি। মানুষের অসুখ বিসুখে কবিরাজ, ওঝা এরাই ভরসা। শহর এখান থেকে অনেক দূরে। যাওয়া-আসার জন্য যানবাহনের তেমন সুবন্দবস্তো
নেই। একুশ বাইশ বছর বয়সি অম্লান এই গ্রামেরই ছেলে। নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করে আর এগোতে পারেনি। সব সময়ই অন্যের উপকার করবার একটা ঝোঁক অম্লানের মধ্যে দেখা যায়। পাড়ার বড় দাদাদের সঙ্গেই ওর বন্ধুত্ব। কাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, কার জন্য কবিরাজ ডেকে দিতে হবে ,কার বাড়ির কি সমস্যা সেটা আলোচনা করে মিটিয়ে দিতে হবে এইসব কাজ নিয়েই পাড়ার দাদাদের সঙ্গে মেতে থাকে। যেহেতু ওরা এই কাজগুলো করে থাকে সেহেতু গ্রামের লোকেরাও ওদের ওপর দেশ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
পাড়ার ঘোষ দার পিতৃ পুরুষের বড় বাড়ি। অনেকগুলি ঘর,  বেশিরভাগই খালি পড়ে থাকে কারণ এখন বাড়িতে যা লোক আছে তাকে অত গুলি ঘরের দরকার নেই।
এদিকে অম্লানদের দিনের পর দিন সামাজিক কাজকর্ম বেড়ে যাওয়ার কারণে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবার জন্য একটা স্থায়ী ঠিকানার দরকার । একদিন সকলে মিলে ঘোষ দাকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলার পর ঘোষ দা ওদের একটা ঘর ছেড়ে দিল।
সুধাংশু নিজের বাড়িতে বসে সাইনবোর্ড লেখার কাজ করে, ওকে বলে পরদিন একটা সাইনবোর্ড লাগানো হলো। সংগঠনের নাম দেওয়া হল "আমাদের কাজ"। নিচে লেখা হল বিভিন্ন প্রকার সামাজিক কাজ, সৎকার সহ ,যেকোনো প্রয়োজনে এখানে যোগাযোগ করুন। তারপর থেকে দুই বেলাই পালা করে ওরা এখানে এসে বসতে লাগলো।

সেদিন ছিল শনিবার। নিম্নচাপের বৃষ্টি গতকাল থেকেই শুরু হয়েছে। কখনো জোরে কখনো মাঝারি বৃষ্টি হয়েই চলেছে। সঙ্গে ঝড়ো হওয়া, আকাশ কালো মেঘে ঢেকে আছে, মাঝে মাঝে বীভৎস জোরে বিদ্যুৎ চমকানোর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
গ্রামের পূবদিকে দাসপাড়ায়, অঞ্জলি, বছর  পঁচিশ বয়সের একটি মেয়ে একাই থাকে। কয়েক বছর আগেই বাবা-মাকে হারিয়ে এখন গ্রামের মানুষের সাহায্য সহযোগিতায় দিন চলে যায়। গতকাল রাতে নিজের ঘরে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যার কারণ কেউই কিছু বুঝতে পারছে না। অনেক বেলা পর্যন্ত দরজা না খোলায় প্রতিবেশী কেউ গিয়ে ডাকাডাকি করার পরও কোন সাড়া না মেলায় আরো দু চারজন জুটিয়ে দরজা ভেঙে দেখা গেল অঞ্জলি গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে।।
অম্লান রা খবর পাওয়ার পর সেখানে ছুটে গেল। মেয়েটার সৎকার তো করতে হবে। প্রাথমিক ক্রিয়াকর্মাদি পাড়ার লোকেরা করে দেওয়ার পর দাহ করবার জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার সময় লোক পাওয়া যাচ্ছে না। একদিকে প্রবল বর্ষা, বৃষ্টি হয়েই চলেছে তার সঙ্গে ঝড়ো হওয়া কেউ যেতে চাইছে না। অনেক বলে কয়ে ছয় জনকে রাজি করানো গেছে। অম্লান সহ আরো পাঁচজন এই দুর্যোগের মধ্যেই দেহটা নিয়ে শ্মশানের দিকে যাত্রা করল।

গ্রাম থেকে শ্মশানের দূরত্ব প্রায় ছয় কিলোমিটার। পৌঁছতে পৌঁছতে রাত প্রায় এগারটা বেজে গেল। গ্রামের শ্মশান বলতে একটা ছোট্ট বিচুলির চাল দেওয়া ঘর। পঞ্চায়েত থেকে কিছুদিন আগে করে দিয়েছে। পাশ দিয়ে একটা সরু খাল বয়ে গেছে এই খালের জলেই মৃতদেহের যাবতীয় ক্রিয়া কর্মাধি করা হয়। দুর্যোগ আবহাওয়ার মধ্যেই যেহেতু কোথাও আলো নেই ওরা একটা হ্যারিকেন জ্বালিয়ে কোন রকমে ঢেকে ঢুকে নিয়ে গেছে। অন্ধকার চারদিকে জল থই থই করছে। খালসহ এলাকার সমস্ত জমি জায়গা জলের উপর ভাসছে। সৎকার করতে হলে তো কাঠ চাই আর একজন পুরোহিত চাই। শ্মশানের কাজ আবার সব পুরোহিত করে না তার জন্য অগ্রদানী ব্রাহ্মণ দরকার। একজন আছে কিন্তু তার বাড়ি শ্মশাণ থেকে অনেক দূরে। দুজনের যেতে হবে। কাঠের দোকানও প্রায় দু কিলোমিটার দূরে। এই বর্ষার দিন এতো রাতে দোকানিকে ডেকে তুলে কাঠ আনতে হবে। লোক তো মোটে ছয় জন। কাঠের দোকানে তিন জনকে যেতেই হবে, আর পুরোহিত ডাকতে দুইজন তাহলে মৃতদেহের এখানে কে থাকবে?
অম্লান সবকিছুতেই কোন কিছু না ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বলল তোমরা যাও আমি থাকবো। নিজেকে খুব সাহসী প্রমাণ করার জন্য অম্লান বলে উঠলো আমি পঞ্চাশ টা দেহ দাহ করেছি, আমার অভিজ্ঞতা আছে কোন অসুবিধা হবে না।
আর দেরি না করে তিনজন চলে গেল কাঠ আনতে আর দুজন গেল পুরোহিতের খোঁজে। অম্লান ঘুটঘুটে অন্ধকারে টিমটিম করে জ্বালানো হ্যারিকেনের আলোয় মরা পাহারা দিচ্ছে। যত রাত বাড়ছে দুর্যোগ ক্রমশ বাড়ছে। চারদিকে ব্যাঙ আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে রাতের পরিবেশ ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। অম্লানের কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগলো। মনে মনে ভাবলো আমি না থাকলেই ভাল হত। অন্য কেউ থাকতো। আমি না হয় ওদের সঙ্গে কাঠ আনতে  গেলেই পারতাম। নানারকম আজগুবি গল্প মনের মধ্যে ভিড় করে আসছে। আর মেয়েটার মৃতদের দিকে সামান্য আলোতে তাকিয়ে দেখছে। হঠাৎ খালের জলে কিছু একটা পড়ার শব্দে অম্লান ভয়ে চমকে উঠল। খালের দিকে চেয়ে দেখতে লাগলো। বেশ কিছুক্ষণ কাটবার পর মৃতদেহের দিকে নজর পড়তেই দেখল মেয়েটার বাঁ পা টা নড়ে উঠল। প্রচন্ড ভয় পেয়ে এখন কি করবে বুঝে ওঠার আগেই দেখল এবার মেয়েটার পেটের নিচটা নড়ে উঠলো। ভয়ে অম্লানের হাত-পা অসাড় হয়ে যেতে লাগলো। তারপর দেখল মৃতদেহের পেটটা বেশ নড়াচড়া করছে। ক্রমে  দেখল বুকটা জোরে জোরে ওঠানামা করছে। অম্লান ভয়ে বাবাগো বলে চিৎকার করে যেই দৌড়ে পালাতে যাবে অমনি কে যেন ওর ডান পা দুহাত দিয়ে চেপে ধরেছে। দৌড়াতে গিয়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল।
ভোর হয়ে গেছে। দুর্যোগ কিছুটা কমেছে। অম্লান তাকিয়ে দেখল নিলয় দা, রহিম দা, কালু দা, গোপাল দা, বাবলু দা সবাই ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। অম্লানের সারা গা ভেজা, চোখ মুখ ভেজা, মাথা ভেজা, মৃতদেহটার কাছাকাছি শুয়ে আছে। আস্তে আস্তে উঠে বসার পর অম্লানকে জিজ্ঞেস করায় গতকাল রাতের পুরো ঘটনাটা খুলে বলল। বাবলুদা বলল তোর বাঁ পাশে দেখ। অম্লান তাকিয়ে দেখলো একটা ভীষণ মোটা জলঢোড়া সাপ মরে পড়ে আছে।।
নিলয় দা বলল বর্ষায় চারিদিকে জলে ভরে গেছে রাতের অন্ধকারে এই সাপটা উঠে এসে মেয়েটার শরীরে ঢাকা দেওয়া চাদরের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল। অন্ধকার আর ঝড় বৃষ্টির তাণ্ডবে দেখতে পাসনি। ভয় পেয়ে দৌড়ে পালাবার সময় কেউ তোর পা টেনে ধরেনি। অসাবধানতায় বাঁশের চিতায় তোর ডান পা টা আটকে গিয়েছিল।আমরা ফিরে এসে তোকে এই অবস্থায় দেখে চোখেমুখে,মাথায় জল দিয়ে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি।
ক্রমশ সকাল হয়ে এল এদিকে কাঠ সহ যা কিছু সামগ্রি সব আনা হয়ে গেছে। পুরোহিত মশাই তার যা ক্রিয়াকর্ম করে দিয়ে রাতেই চলে গেছে। এখন সকলে মিলে অঞ্জলি র দাহর ব্যবস্থা করতে লাগলো।

No comments: