Tuesday, July 21, 2026

মহাকালের ক্ষুরধার বীরগাথা -- পলাশ কান্তি বালা

মহাকালের ক্ষুরধার বীরগাথা”
পলাশ কান্তি বালা
১২ জুলাই, ২০২৬
শরতের সেই আদিম আলো চিরে,
যখন গর্জে উঠেছিল মহর্ষি বাল্মীকির
প্রথম অনুষ্টুপ ছন্দের করুণ শ্লোক;
তখন ধনুর্বিদ্যার এক পরম ও সুউচ্চ শিখরে
দাঁড়িয়ে ছিলেন অযোধ্যার শ্রীরাম।
অধৰ্ম আর অন্যায়ের দশ মাথা কেটে,
রাবণ বধের সেই যে অবিনাশী উপাখ্যান,
তা আজো মানুষের হৃদয়ে এক পরম ধ্রুবতারা।
তারই সমান্তরালে, পবনের বেগে
শক্তি আর রণকৌশলের জাদুকরী নৃত্যে;
লঙ্কা দহন আর সঞ্জীবনী পাহাড় বয়ে আনা হনুমান,
ইতিহাসে হয়ে রইলেন একলা ভক্তির পরম নোঙর।

কুরুক্ষেত্রের সেই সুসংহত ও ধূসর রণাঙ্গনে,
দিব্যাস্ত্র আর গাণ্ডীবের তীব্র টংকারে
শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হয়ে জেগেছিলেন অর্জুন।
অথচ তারই সমান্তরালে, জরাসন্ধ আর
দুর্যোধন বধের সেই তীব্র গদা-যুদ্ধে—
ভীমের একেকটি আঘাত ছিল বলবিজ্ঞানের এক অমোঘ সূত্র।
কুন্তীর কানীন পুত্র, অদ্বিতীয় বীর কর্ণ,
নিজের সর্বস্ব ও কবচ-কুণ্ডল বিসর্জন দিয়ে
ঘটোৎকচ বধের যে নির্মম ট্র্যাজেডি রচেছিলেন;
তা আজো মানুষের চোখে অশ্রুর প্লাবন নামায়।
আর প্রথম দশ দিন কৌরব সেনার সিংহাসন আগলে,
ইচ্ছামৃত্যুর শয্যায় শুয়ে থাকা মহাপ্রাজ্ঞ ভীষ্ম—
লিখে গেছেন একলা সেনানায়কের অবিনাশী মহাকাব্য।

রাক্ষস কুলের শ্রেষ্ঠ ও অজেয় বীর ইন্দ্রজিৎ,
যাঁর মায়াবিদ্যা আর অলৌকিক দিব্যাস্ত্রের তীব্র টানে
কেঁপে উঠেছিল খোদ স্বর্গের দেবরাজ ইন্দ্রের সিংহাসন।
নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারের নিভৃত অন্ধকারে বসে,
যিনি নিজের তপোবলে বন্দী করেছিলেন ইন্দ্রকে;
আর নাগপাশের বিষাক্ত ও নিচ্ছিদ্র বন্ধনে
বেঁধে ফেলেছিলেন রাম-লক্ষ্মণের অদম্য কায়াকে।
তাঁর সেই অবিনাশী ও রহস্যময় যুদ্ধকৌশল,
মহাকাব্যের কপালে আজো এক আশ্চর্য জ্যামিতি,
যা প্রমাণের মশাল জ্বেলে বুঝিয়ে দেয়—
শত্রুর শিবিরেও কতখানি প্রজ্ঞাবান বীর জন্মাতে পারে।

মহাকাব্যের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ক্যানভাস ছেড়ে,
যখন শিলালিপি আর সমসাময়িক দলিলের পাতায়—
গর্জে ওঠে বাস্তব ইতিহাসের অমোঘ সত্য;
তখন গেরিলা যুদ্ধের জাদুকরী কৌশলে
মারাঠা স্বরাজ প্রতিষ্ঠা করা শিবাজি মহারাজ,
হয়ে ওঠেন এক নতুন ভোরের বীরত্বময় ইশারা।
হালদিঘাটের সেই তপ্ত ও রক্তাক্ত ধূলিঝড়ে,
আকবরের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে অনমনীয় থেকে,
যিনি লড়েছিলেন নিজের চেতক ঘোড়ার পিঠে চড়ে—
তিনিই তো অদম্য প্রতিরোধের প্রতীক মহারানা প্রতাপ!
আর ব্রহ্মপুত্রের উত্তাল স্রোতে, সরাইঘাটের নৌযুদ্ধে,
মুঘলদের দম্ভকে চূর্ণ করা বীর লাচিত বরফুকন;
দেখিয়ে গেছেন এই উপদ্বীপের স্বাধীনতা রক্ষার বাস্তব বলবিজ্ঞান।

তাই পুরাণ আর ইতিহাসের এই সুদীর্ঘ পথপরিক্রমা
আসলে মহাকালের ক্যানভাসে দুই ভিন্ন স্পন্দন।
মহাকাব্যের বীরেরা যেখানে আধ্যাত্মিক ও অলৌকিক,
ইতিহাসের যোদ্ধারা সেখানে দলিল আর মাটির অগ্নিসাক্ষ্য।
উৎস ও প্রেক্ষাপটের এই ভিন্ন জ্যামিতিক বিন্যাসে,
মানুষকে কোনো সংকীর্ণ দেয়ালের খাঁচায় বন্দী রাখা যায় না;
চব্বিশের এই আধুনিক ভূ-রাজনীতিতেও
তাদের এই অবিনাশী ও ক্ষুরধার শৌর্যগাথা—
আমাদের প্রগতির মানচিত্রে এক অবিনাশী ধ্রুবতারা,
যেখানে শরীর ক্ষয়ে যায় ধুলোয়, কিন্তু বীরত্ব অমর রয়।

No comments: